সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার শিববাড়ি এলাকায় ট্রেনের ধাক্কায় গুরুতর আহত হয়ে ডোবায় পড়ে যাওয়া পোষা হাতিটিকে শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি। দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের মধ্যেই সোমবার (আজ) দুপুরে হাতিটির মৃত্যু হয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত হাতিটির মালিকপক্ষের প্রতিনিধি এবং প্রাণীসেবা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মৃত হাতিটির নাম সুন্দরমালা। বয়স ছিল প্রায় ৪২ বছর। মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা এলাকার বাসিন্দা কামরুল ইসলাম হাতিটির মালিক। ঢাকাভিত্তিক প্রাণীসেবা প্রতিষ্ঠান পিপল ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান রাকিবুল হক জানান, সকাল থেকেই হাতিটি নিস্তেজ অবস্থায় পড়ে ছিল। দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে সেটির মৃত্যু হয়। এ সময় মালিকপক্ষের প্রতিনিধি আবদুস সবুর ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।
রাকিবুল হক জানান, ডোবা থেকে উদ্ধারের পর হাতিটির দাঁড়ানোর মতো শারীরিক শক্তি ছিল না। পেট অস্বাভাবিকভাবে ফোলা ছিল এবং পেছনের ডান পা একেবারেই নড়াতে পারছিল না। পাশাপাশি পিঠে, বিশেষ করে মেরুদণ্ডের মাঝ বরাবর গুরুতর আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। চিকিৎসকদের ধারণা, এসব আঘাত ও দীর্ঘ সময় পানিতে পড়ে থাকার কারণে হাতিটির রক্তচাপ বেড়ে গিয়ে হার্ট অ্যাটাক হয়ে থাকতে পারে।
কীভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটে
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, পৌষসংক্রান্তি উপলক্ষে সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার কালীগঞ্জ এলাকায় আয়োজিত রথযাত্রা ও মেলায় হাতিটিকে ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। অনুষ্ঠান শেষে শনিবার রাতে দুই মাহুত—ইমন ও রাকিব—হাতিটিকে নিয়ে ফেরার পথে দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ি এলাকায় একটি ট্রেনের ধাক্কায় হাতিটি রেললাইনের পাশের ডোবায় পড়ে যায়।
পরদিন রোববার দুপুরে স্থানীয় প্রশাসন, বন বিভাগ, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি চিকিৎসকদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় পেলোডার ও রশির সাহায্যে হাতিটিকে ডোবা থেকে উদ্ধার করা হয়। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার ফলে হাতিটি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিল। প্রাথমিকভাবে স্যালাইন দেওয়া হয় এবং এর আগে স্টেরয়েড ও অ্যান্টিহিস্টামিন প্রয়োগ করা হয়েছিল।
হাতিটির পরিচিতি ও চিকিৎসা তথ্য
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| হাতিটির নাম | সুন্দরমালা |
| বয়স | ৪২ বছর |
| মালিক | কামরুল ইসলাম |
| দুর্ঘটনার স্থান | শিববাড়ি, দক্ষিণ সুরমা, সিলেট |
| মৃত্যুর সময় | দুপুর ১২টা ৪০ মিনিট |
| সম্ভাব্য মৃত্যুর কারণ | আঘাতজনিত জটিলতা ও হার্ট অ্যাটাক |
এ বিষয়ে হাতিটির মালিক কামরুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
একা হয়ে গেল শাবক বীর বাহাদুর
রাকিবুল হক আরও জানান, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি কুলাউড়ার কর্মধা এলাকায় মারা যায় সুন্দরমালার একমাত্র সন্তান, সাত বছর বয়সী হাতি বীর বাহাদুর। তাকে সনাতন পদ্ধতিতে ‘হাদানি’ প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে শাবকটিকে মায়ের কাছ থেকে আলাদা করে পায়ে দড়ি বেঁধে আটকে রাখা হয়েছিল। বিষয়টি জানাজানি হলে বন বিভাগ আপত্তি জানায়। পরে তাদের অনুরোধে ২ জানুয়ারি শাবকটিকে শৃঙ্খলমুক্ত করে কালাপাহাড় জঙ্গলে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু আজ মায়ের মৃত্যুর পর বীর বাহাদুর আবারও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ল।
এই ঘটনা আবারও পোষা হাতির নিরাপত্তা, ব্যবহার এবং কল্যাণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে বলে মনে করছেন প্রাণী অধিকারকর্মীরা।
