ট্রাম্পের নির্দেশে নাইজেরিয়ায় ভয়াবহ মার্কিন হামলা

নাইজেরিয়ার সরকারের অনুরোধে দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ইসলামিক স্টেট (আইএস)–এর অবস্থান লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে। বৃহস্পতিবার এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মার্কিন সামরিক বাহিনী। ওয়াশিংটনের দাবি, ওই অঞ্চলে আইএসের সশস্ত্র গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর সহিংস হামলা চালাচ্ছিল, যার প্রধান লক্ষ্য ছিল খ্রিষ্টান সম্প্রদায়।

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, “কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে আমার সরাসরি নির্দেশে আজ রাতে যুক্তরাষ্ট্র উত্তর-পশ্চিম নাইজেরিয়ায় আইএস সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ও প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে। তারা নিরীহ মানুষ, বিশেষ করে খ্রিষ্টানদের নির্মমভাবে হত্যা করছিল—এমন বর্বরতা বহু বছর, এমনকি শতাব্দীতেও দেখা যায়নি।” তিনি আরও বলেন, ধর্মীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কখনো নীরব দর্শক হয়ে থাকবে না।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর আফ্রিকা কমান্ড (আফ্রিকম) জানায়, নাইজেরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের ভিত্তিতে সকোতো অঙ্গরাজ্যে এই অভিযান পরিচালিত হয়। প্রাথমিক মূল্যায়নে আইএসের একাধিক সদস্য নিহত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। আফ্রিকমের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নাইজেরিয়ার আনুষ্ঠানিক অনুরোধের পরই এই হামলা চালানো হয়। তবে পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত একটি বিবৃতি সরিয়ে নেওয়া হলে বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা শুরু হয়।

এই সামরিক অভিযানের পেছনে ট্রাম্পের আগের বক্তব্য ও অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গত অক্টোবরের শেষ দিকে তিনি নাইজেরিয়ায় খ্রিষ্টানদের ওপর চলমান সহিংসতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, দেশটিতে খ্রিষ্টধর্ম একটি ‘অস্তিত্বগত হুমকি’র মুখে পড়েছে। সে সময় তিনি সহিংসতা বন্ধে ব্যর্থ হলে নাইজেরিয়ায় সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপেরও হুমকি দেন। এর ধারাবাহিকতায় বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানায়, নভেম্বরের শেষ দিক থেকে নাইজেরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য যুক্তরাষ্ট্র নজরদারি উড়োজাহাজ মোতায়েন করেছে।

নাইজেরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান নিরাপত্তা সহযোগিতার অংশ হিসেবেই এই হামলা পরিচালিত হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও কৌশলগত সমন্বয়ের মাধ্যমে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ঘাঁটি চিহ্নিত করে নির্ভুলভাবে আঘাত হানা সম্ভব হয়েছে বলে দাবি করে মন্ত্রণালয়। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তারা জানায়, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সন্ত্রাসী তৎপরতা দমনে এই সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এদিকে পেন্টাগনের প্রকাশিত একটি ভিডিওতে যুদ্ধজাহাজ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দৃশ্য দেখা যায়। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, আইএসের পরিচিত একাধিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করেই এই হামলা চালানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এক্সে নাইজেরিয়া সরকারকে সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে লেখেন, “আরও আসছে…”, যা ভবিষ্যতে আরও সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

তবে নাইজেরিয়া সরকার সহিংসতাকে কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করার বিরোধিতা করেছে। দেশটির কর্মকর্তাদের মতে, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মুসলিম ও খ্রিষ্টান—উভয় সম্প্রদায়কেই লক্ষ্য করে হামলা চালায়। তারা বলেন, শুধু খ্রিষ্টান নির্যাতনের বিষয়টি সামনে আনলে দেশের জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও ধর্মীয় সহাবস্থানের বাস্তবতা আড়াল হয়ে যেতে পারে। তবুও সন্ত্রাসবিরোধী সক্ষমতা বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ চালিয়ে যেতে তারা আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

আফ্রিকার সবচেয়ে জনবহুল দেশ নাইজেরিয়ায় উত্তরাঞ্চলে প্রধানত মুসলিম এবং দক্ষিণাঞ্চলে সংখ্যাগরিষ্ঠ খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর বসবাস। এই ধর্মীয় বিভাজনের মধ্যেই বৃহস্পতিবার দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি মসজিদে সন্দেহভাজন আত্মঘাতী বোমা হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত এবং ৩৫ জন আহত হন বলে জানিয়েছে পুলিশ। ওই অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই ইসলামপন্থী বিদ্রোহীদের সহিংসতায় অস্থির হয়ে রয়েছে।

এর আগে বড়দিন উপলক্ষে এক বার্তায় নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বোলা টিনুবু দেশের ভেতরে শান্তি ও ধর্মীয় সহনশীলতার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, নাইজেরিয়ায় ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং খ্রিষ্টান, মুসলিমসহ সব নাগরিককে সহিংসতা থেকে রক্ষা করা তার সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।

বড়দিনের দিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের পাম বিচে নিজের মার-আ-লাগো ক্লাবে অবস্থানকালে ট্রাম্প এই হামলা নিয়ে বক্তব্য দেন। ওই দিন তার কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ছিল না। এর আগে গত সপ্তাহে সিরিয়ায় আইএসের বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে সন্দেহভাজন আইএস হামলার পর পাল্টা জবাব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন ট্রাম্প।

বিশ্লেষকদের মতে, নাইজেরিয়ায় এই হামলা শুধু একটি সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান নয়; বরং ট্রাম্প প্রশাসনের বৈশ্বিক নিরাপত্তা কৌশল এবং ধর্মীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে তাদের কঠোর অবস্থানেরও প্রতিফলন। তবে এই ধরনের সামরিক পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে নাইজেরিয়ার জটিল নিরাপত্তা সংকট কতটা প্রশমিত করতে পারবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে এখনো সংশয় রয়ে গেছে।