কক্সবাজারের টেকনাফে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া পাচারের প্রস্তুতিকালে এক ঝটিকা অভিযানে নারী ও শিশুসহ ৫৫ জন ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। একই সাথে এই পাচার প্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি জড়িত পাঁচজন সক্রিয় মানব পাচারকারীকে আটক করতে সক্ষম হয়েছে বাহিনীটি। গতকাল শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে কোস্ট গার্ডের সদর দপ্তরে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক এই সফল অভিযানের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।
অভিযানের পটভূমি ও উদ্ধার কার্যক্রম
কোস্ট গার্ডের গোয়েন্দা শাখা জানতে পারে যে, টেকনাফের বাহারছড়া সমুদ্র উপকূলীয় এলাকা ব্যবহার করে একটি সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্র বিপুল সংখ্যক মানুষকে ট্রলারে করে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় পাচারের পরিকল্পনা করছে। তথ্যের সত্যতা যাচাই করে গত বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) রাত ১০টার দিকে কোস্ট গার্ডের আউটপোস্ট বাহারছড়া, শাহপরী ও টেকনাফ স্টেশনের সদস্যরা একটি সমন্বিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেন।
অভিযান চলাকালীন আভিযানিক দল সমুদ্রের মোহনায় একটি সন্দেহজনক বোট দেখতে পায়। কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে বোটটিকে থামার সংকেত দেওয়া হলেও পাচারকারীরা তা অমান্য করে দ্রুত পালানোর চেষ্টা করে। দীর্ঘক্ষণ ধাওয়া করার পর বাহারছড়ার কচ্ছপিয়া সংলগ্ন সমুদ্র এলাকায় বোটটিকে আটক করতে সক্ষম হয় কোস্ট গার্ড। তল্লাশি চালিয়ে বোটের ভেতর থেকে গাদাগাদি করে রাখা ৫৫ জন ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা হয় এবং পালানোর চেষ্টাকালে পাঁচজন পাচারকারীকে হাতেনাতে আটক করা হয়।
নিচে উদ্ধারকৃত ভুক্তভোগী ও অভিযানের সংক্ষিপ্ত বিবরণ সারণি আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| অভিযানের স্থান | বাহারছড়া কচ্ছপিয়া সংলগ্ন সমুদ্র এলাকা, টেকনাফ। |
| উদ্ধারকৃত মোট সংখ্যা | ৫৫ জন (নারী, শিশু ও পুরুষ)। |
| আটক পাচারকারী | ৫ জন (সক্রিয় মানব পাচারকারী চক্রের সদস্য)। |
| অভিযান পরিচালনাকারী | বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড (বাহারছড়া ও শাহপরী আউটপোস্ট)। |
| পাচারের গন্তব্য | মালয়েশিয়া (সাগর পথে অবৈধভাবে)। |
| আটক বোটের ধরণ | কাঠের তৈরি ইঞ্জিন চালিত মাছ ধরার ট্রলার। |
পাচারকারীদের কৌশল ও প্রলোভন
উদ্ধারকৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে যে, পাচারকারী চক্রটি অত্যন্ত সুকৌশলে তাদের ফাঁদে ফেলে। উন্নত জীবনের রঙিন স্বপ্ন, বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরি এবং নামমাত্র খরচে বিদেশ যাত্রার মতো লোভনীয় প্রলোভন দেখিয়ে টেকনাফসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাংলাদেশি নাগরিক এবং ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নাগরিকদের মালয়েশিয়া গমনে উদ্বুদ্ধ করা হয়। মূলত সমুদ্রের উত্তাল পরিস্থিতি এবং জীবনের ঝুঁকি উপেক্ষা করেই এই সংঘবদ্ধ চক্রটি সাধারণ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছিল।
আইনি পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ সতর্কতা
লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক জানান, উদ্ধারকৃত ভুক্তভোগী এবং আটক মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। তাঁদের টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তরের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন যে, মানবপাচার রোধে এবং সমুদ্রপথে যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কোস্ট গার্ডের টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি ভবিষ্যতে আরও জোরদার করা হবে।
উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের পাচারকারীদের প্রলোভন থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে প্রশাসন। সাগর পথে অবৈধ যাত্রা রুখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতাও একান্ত প্রয়োজন।
