টাঙ্গাইল, ২ মার্চ ২০২৫ (বাসস): পবিত্র মাহে রমজানকে সামনে রেখে হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা পূরণে ব্যস্ত সময় পার করছেন টাঙ্গাইলের মুড়ি তৈরির কারিগররা। বিশেষ করে কালিহাতী উপজেলার নারান্দিয়া গ্রামের মুড়ির খ্যাতি দেশজুড়ে থাকায় এখানকার কারিগররা দিন-রাত পরিশ্রম করে মুড়ি উৎপাদনে ব্যস্ত রয়েছেন।
ইফতারের অন্যতম উপাদান হিসেবে মুড়ির চাহিদা বছরজুড়ে থাকলেও রমজান মাসে এর উৎপাদন ও বিক্রি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে নারান্দিয়ার মুড়ি দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। বিশেষত সিরাজগঞ্জ, পাবনা, ঢাকা, জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ, বগুড়া ও গাজীপুরের পাইকাররা এখানে এসে মুড়ি সংগ্রহ করেন।
Table of Contents
টাঙ্গাইলে রমজান ঘিরে ব্যস্ত সময় পার করছেন মুড়ি কারিগররা
হাতে ভাজা মুড়ির ঐতিহ্য ও সংকট
নারান্দিয়া ও আশপাশের প্রায় ১৫টি গ্রামের শতাধিক পরিবার বহু বছর ধরে হাতে ভাজা মুড়ি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। মোদক সম্প্রদায়ের বহু মানুষ এই পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন। হাতে ভাজা মুড়ির পাশাপাশি মেশিনের সাহায্যে মুড়ি তৈরি হলেও হাতে ভাজা মুড়ির স্বাদ ও গুণগত মান আলাদা হওয়ায় এর চাহিদা এখনো অটুট রয়েছে। তবে সময় ও শ্রম বেশি লাগার কারণে অনেক কারিগর এ পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে যাচ্ছেন।
দৌলতপুর গ্রামের রাধা রানী মোদক বলেন, “আমরা বংশপরম্পরায় মুড়ি ভাজার কাজে যুক্ত। ধান সিদ্ধ করে শুকিয়ে, তা মাড়াই করে লবণ-জলে ভিজিয়ে হাতে মুড়ি ভাজতে হয়। এ কাজে প্রচুর পরিশ্রম লাগে, কিন্তু লাভ তুলনামূলক কম।”
একজন ব্যক্তি প্রতিদিন এক থেকে দেড় মণ চালের মুড়ি ভাজতে পারেন, যা থেকে প্রায় ২৩-২৪ কেজি মুড়ি পাওয়া যায়। বর্তমানে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি মুড়ি ১৩০ টাকায় এবং খুচরা বাজারে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মেশিনের চাপে হাতে ভাজা মুড়ির সংকট
মেশিনের সাহায্যে দ্রুত উৎপাদিত মুড়ির বাজার সম্প্রসারিত হওয়ায় হাতে ভাজা মুড়ির কারিগররা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। মেশিনে তৈরি মুড়ির লাভ বেশি হওয়ায় অনেকেই মেশিনভিত্তিক উৎপাদনে ঝুঁকছেন। তবে হাতে ভাজা মুড়ির স্বাদের কারণে একশ্রেণীর ভোক্তা এখনো এ মুড়িকে বেশি প্রাধান্য দেন।
সততা মুড়ি মিলের স্বত্বাধিকারী শংকর চন্দ্র মোদক বলেন, “রমজানে পাইকাররা মোবাইলেও মুড়ির অর্ডার দেন। তবে বছরের অন্যান্য সময় মুড়ির বাজার কমে যায়।”
সরকারি সহায়তার দাবি
নারান্দিয়ার মুড়ি শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে ও কারিগরদের উৎসাহিত করতে সরকারি সহায়তার প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বীর মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান মজনু বলেন, “এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। কিন্তু লাভ কম হওয়ায় অনেকে এ পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। এ জন্য সরকারি ঋণ ও অন্যান্য সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন।”
টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, “প্রান্তিক মুড়ি কারিগরদের সহযোগিতায় স্বল্প সুদে ঋণ প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং হাতে ভাজা মুড়ির ব্র্যান্ডিং ও প্রচার বাড়ানোর ব্যবস্থা করা হবে।”
উপসংহার
নারান্দিয়ার হাতে ভাজা মুড়ি দেশের ঐতিহ্যের অংশ। রমজান মাসে এ মুড়ির চাহিদা তুঙ্গে থাকলেও মেশিনের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। এই শিল্পকে ধরে রাখতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি, যাতে কারিগররা তাদের ঐতিহ্যবাহী পেশা চালিয়ে যেতে পারেন।
