বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে দ্রুত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানির বিস্তার, বৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক পরিবহনব্যবস্থা এবং ডিজিটাল বাণিজ্যের দ্রুত অগ্রগতি দেশের সামগ্রিক ঝুঁকিপ্রেক্ষাপটকে আমূল বদলে দিয়েছে। নতুন সুযোগের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে বহুমাত্রিক ঝুঁকি—অগ্নিকাণ্ড, শিল্প দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সরবরাহশৃঙ্খল ব্যাহত হওয়া, পরিবহনজনিত ক্ষতি, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ঝুঁকি, আর্থিক অনিয়ম ও সাইবার অপরাধ এখন ব্যবসার জন্য সমান্তরাল চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় বীমা আর কেবল আইনগত বাধ্যবাধকতা নয়; এটি ব্যবসার ধারাবাহিকতা, পুঁজি সুরক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার একটি কৌশলগত হাতিয়ার।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বীমাগ্রাহকদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—বীমা কি সরাসরি বীমা কোম্পানি থেকে নেওয়া হবে, নাকি বীমা ব্রোকারের মাধ্যমে নেওয়াই বেশি কার্যকর? বিষয়টি শুধু প্রিমিয়ামের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে কভারেজের বাস্তবতা, দাবি নিষ্পত্তির সহজতা এবং ক্ষতির সময় প্রকৃত সহায়তা পাওয়ার নিশ্চয়তা।
ডিরেক্ট বীমা ব্যবস্থায় গ্রাহক সরাসরি বীমা কোম্পানির কাছ থেকে পলিসি গ্রহণ করেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনলাইন কোটেশন, দ্রুত নবায়ন ও ডিজিটাল সেবার কারণে এই পদ্ধতির জনপ্রিয়তা বেড়েছে। ব্যক্তি গ্রাহক, ক্ষুদ্র ব্যবসা কিংবা তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ প্রয়োজন—যেমন মোটর বীমা, সাধারণ অগ্নিবীমা বা মানক স্বাস্থ্যবীমার ক্ষেত্রে ডিরেক্ট বীমা সময় ও প্রশাসনিক দিক থেকে সুবিধাজনক।
অন্যদিকে, বীমা ব্রোকার মূলত গ্রাহকের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন, বীমা কোম্পানির নয়। তাদের কাজ শুরু হয় ঝুঁকি বিশ্লেষণ দিয়ে—প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম, সম্পদ, অতীত ক্ষতির ইতিহাস, সরবরাহশৃঙ্খল ও সম্ভাব্য দুর্বলতা পর্যালোচনা করে। এরপর তারা বাজারের একাধিক বীমা কোম্পানির প্রস্তাব তুলনা করে গ্রাহকের জন্য উপযোগী বীমা কাঠামো তৈরি করেন। পলিসির শর্ত, ব্যতিক্রম, ডিডাক্টিবল ও দায়সীমা নিয়ে সক্রিয়ভাবে দরকষাকষি করেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ক্ষতির সময় দাবি প্রস্তুত, উপস্থাপন ও আলোচনায় ব্রোকারের ভূমিকা প্রায়ই চূড়ান্ত ক্ষতিপূরণের অঙ্ক নির্ধারণে বড় প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, নির্মাণ, লজিস্টিকস, আমদানি–রপ্তানি ও আর্থিক খাতে এই পার্থক্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। একটি কারখানায় অগ্নিকাণ্ড হলে কেবল ভবন বা যন্ত্রপাতির ক্ষতিই নয়, উৎপাদন বন্ধ, রপ্তানি বিলম্ব, ক্রেতার জরিমানা ও চুক্তি বাতিলের ঝুঁকিও তৈরি হয়। এসব ক্ষেত্রে শুধু সাধারণ অগ্নিবীমা যথেষ্ট নয়; ব্যবসা বন্ধজনিত ক্ষতি, যন্ত্রপাতি বিকল হওয়া, বৈদ্যুতিক ক্ষতি ও সঠিক স্টক মূল্যায়নের মতো অতিরিক্ত কভার প্রয়োজন হয়, যা সমন্বিতভাবে সাজাতে ব্রোকাররা তুলনামূলকভাবে দক্ষ।
নিচের টেবিলে দুই পদ্ধতির মূল পার্থক্য তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | ডিরেক্ট বীমা | বীমা ব্রোকার |
|---|---|---|
| ঝুঁকি মূল্যায়ন | সীমিত ও মানক | গভীর ও কাস্টমাইজড |
| পলিসি নির্বাচন | একক বীমা কোম্পানি | একাধিক কোম্পানির তুলনা |
| শর্ত দরকষাকষি | খুবই সীমিত | সক্রিয় ও পেশাদার |
| দাবি সহায়তা | প্রক্রিয়াগত | পরামর্শ ও প্রতিনিধিত্ব |
| উপযোগিতা | কম ঝুঁকি, সহজ প্রয়োজন | জটিল ও উচ্চ ঝুঁকি |
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের ডিরেক্ট বীমার বড় সীমাবদ্ধতা হলো জটিল পলিসি ভাষা ও লুকানো ব্যতিক্রম। কম প্রিমিয়াম বা দ্রুত সেবায় আকৃষ্ট হয়ে অনেকেই দাবি ওঠার সময় পর্যাপ্ত কভারেজ না পাওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন। ফলে এখন প্রতিষ্ঠানগুলো শিরোনামমূল্যের চেয়ে “দাবি সক্ষমতা”কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, যেসব ব্যবসার ঝুঁকি জটিল, সম্পদের পরিমাণ বড় বা আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা রয়েছে, তাদের জন্য বীমা ব্রোকারের মাধ্যমে বীমা গ্রহণ অধিক কার্যকর। আর যাদের প্রয়োজন সহজ ও ঝুঁকি সীমিত, তাদের জন্য ডিরেক্ট বীমা একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প। সঠিক চ্যানেল নির্বাচন তাই কেবল কেনাকাটার সিদ্ধান্ত নয়, বরং কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অপরিহার্য অংশ।
