ইরান ও ইস্রায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে তেলের প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে ইতিমধ্যেই প্রতিফলিত হয়েছে। গত এক মাসে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং এর ধাক্কা পরিবহন, শিল্প, কৃষি ও খাদ্যপণ্যের উৎপাদন খরচে পড়ছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোই এর সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন কৌশল নিয়েছে। চলুন দেশভিত্তিক পদক্ষেপগুলো বিশ্লেষণ করা যাক।
দেশভিত্তিক পদক্ষেপ
| দেশ | প্রধান ব্যবস্থা | প্রত্যাশিত প্রভাব | অতিরিক্ত তথ্য |
|---|---|---|---|
| যুক্তরাজ্য | হিটিং অয়েলের জন্য ৫৩ মিলিয়ন পাউন্ড সহায়তা; বাজার পর্যবেক্ষণ | পেট্রলের দাম কমানো; অতিরিক্ত মুনাফা নিয়ন্ত্রণ | পেট্রল রিটেইলার্স অ্যাসোসিয়েশন হস্তক্ষেপ অস্বীকার |
| চীন | বিপুল তেল মজুদ (৯০ কোটি ব্যারেল); সাময়িক রপ্তানি বন্ধ | বাজারে মূল্য স্থিতিশীলতা | তিন মাসের আমদানি সমপরিমাণ মজুদ |
| ভারত | ৬০ দিনের অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ নিশ্চিত; আতঙ্কজনিত মজুদ এড়াতে আহ্বান | সরবরাহে নিরাপত্তা; হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন নিয়ন্ত্রণ | ভারতের তেল মন্ত্রণালয় নাগরিকদের সচেতন করেছে |
| আয়ারল্যান্ড | পেট্রল ও ডিজেলের কর কমানো; হিটিং অয়েল সহায়তা চার সপ্তাহ বাড়ানো | গৃহস্থালির জ্বালানি ব্যয় হ্রাস | ন্যাশনাল অয়েল রিজার্ভস এজেন্সি উদ্যোগী |
| অস্ট্রেলিয়া | গণপরিবহনে বিনা ভাড়া; ভিক্টোরিয়া ও তাসমানিয়ায় | ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার কমানো; পরিবহন খরচ কমানো | পেট্রলের দাম লিটারপ্রতি ২.৩৮ অস্ট্রেলিয়ান ডলার |
| মিসর | রাত ৯টার মধ্যে দোকান, রেস্তোরাঁ ও ক্যাফে বন্ধ; সরকারি কর্মীদের একদিন বাসা থেকে কাজ | জ্বালানি ব্যয় কমানো; অফিস ও প্রতিষ্ঠান খরচ কমানো | সরকারি যানবাহনের জ্বালানি বরাদ্দ এক-তৃতীয়াংশ কমানো |
| ফিলিপাইনস | জাতীয় জরুরি অবস্থা; সরকারি কর্মীদের চার দিনের সপ্তাহ; পরিবহন ভর্তুকি সীমিত | ডিজেল ও পেট্রলের দাম নিয়ন্ত্রণ; জনগণকে সর্তক রাখা | ১০ লাখ ব্যারেল অতিরিক্ত তেল মজুদ পরিকল্পনা |
| শ্রীলঙ্কা | সরকারি ছুটি ঘোষণা; তেল রেশনিং | ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য ১৫ লিটার, মোটরসাইকেলের জন্য ৫ লিটার | ২০২২ সালের তেলের অভিজ্ঞতা কার্যকর |
| থাইল্যান্ড | হালকা পোশাক পরার আহ্বান; হিটিং যন্ত্রের তাপমাত্রা ২৬–২৭ ডিগ্রি; সরকারি কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ | জ্বালানি খরচ কমানো | শীতাতপনিয়ন্ত্রণ সীমিত করা হয়েছে |
| ইথিওপিয়া | গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও পণ্য অগ্রাধিকার; গণপরিবহনে পেট্রল অগ্রাধিকার | সংকটময় অঞ্চলে সরবরাহ সীমিত | তিগ্রা অঞ্চলে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ |
| মিয়ানমার | জোড়-বিজোড় লائسেন্স অনুসারে গাড়ি চলাচল; ডিজিটাল কিউআর কোড | ব্যক্তিগত গাড়ির জ্বালানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ | বৈদ্যুতিক গাড়ি নিয়মের বাইরে |
| ভিয়েতনাম | বাড়িতে থাকার আহ্বান; সাইকেল ও কারপুলিং; পরিবেশ সুরক্ষা কর ও ভ্যাট ছাড় | জ্বালানি ব্যয় হ্রাস | গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান |
| স্লোভেনিয়া | রেশনিং: ব্যক্তিগত গাড়ি ৫০ লিটার, ব্যবসা ও কৃষি ২০০ লিটার | তেলের সংরক্ষণ | ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে প্রথম দেশ |
| দক্ষিণ সুদান | বিদ্যুৎ রেশনিং; পর্যায়ক্রমে সরবরাহ বিচ্ছিন্ন | শহরে বিদ্যুৎ ব্যয় ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ | ৯৬% বিদ্যুৎ তেলনির্ভর; মজুদ মূলত রপ্তানির জন্য |
বিশ্লেষণ
সংক্ষিপ্ত ও দীর্ঘমেয়াদি উভয় দিকেই দেশের কৌশল ভিন্ন। যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া সরাসরি ভোক্তাকে সহায়তা করছে। চীন ও ভারত সরবরাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখছে। শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার ও স্লোভেনিয়া তেলের ব্যবহার সীমিত করছে। ফিলিপাইনস, মিসর ও থাইল্যান্ড জনগণকে জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও ব্যবহার হ্রাসে উদ্বুদ্ধ করছে।
এই সংকট প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও সংরক্ষণী ব্যবস্থা না থাকলে বিশ্ব অর্থনীতি ও নাগরিক জীবনে বড় প্রভাব পড়ে। দেশগুলো এই মুহূর্তে সংকট মোকাবিলায় জোরকদমে পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, তবে স্থায়ী সমাধান ছাড়া দামের অস্থিরতা এবং সরবরাহের ব্যাঘাত চলতেই পারে।
বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষায় জ্বালানি সংরক্ষণ, সরবরাহের নিরাপত্তা এবং ভোক্তা সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
