জেন-জি আন্দোলন:আরব বসন্তের মতোই কি ছায়া ফেলছে

গত কয়েক বছরে বিশ্বজুড়ে তরুণ সমাজ, বিশেষত জেনারেশন-জেড বা জেন-জির নেতৃত্বে গণ-আন্দোলনের ঢেউ বইছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তরুণরা রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের দাবিতে সড়কে নেমেছে। ২০২২ সালের শ্রীলংকা থেকে শুরু করে ২০২৫ সালে নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, ফিলিপাইন, মাদাগাস্কার এবং তিমুর-লেস্তে পর্যন্ত এই আন্দোলনগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল—দুর্নীতি দমন, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক ন্যায্যতা নিশ্চিত করা এবং তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণে গুরুত্ব প্রদান।

বিশ্লেষকদের মতে, জেন-জি আন্দোলনের বর্তমান ধারা অনেকাংশে ২০১০–২০১১ সালের আরব বসন্তের সঙ্গে তুলনীয়। আরব বসন্তকে শুরুতে যুগান্তকারী মনে করা হয়েছিল। তিউনিসিয়ায় প্রাথমিক সাফল্যের পরও সেখানে নতুনভাবে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে। অনুরূপভাবে, জেন-জি আন্দোলনও প্রাথমিক প্রভাব দেখালেও কাঠামোগত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সংস্কারে বড় পরিবর্তন আনতে এখনও ব্যর্থ।

জেনজি আন্দোলনের আন্তর্জাতিক চিত্র

গত কয়েক বছরে জেন-জি আন্দোলনের তরঙ্গ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শিক্ষার্থী ও তরুণ নাগরিকরা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং ইউরোপের কিছু দেশে তরুণরা দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছে।

বিশ্বব্যাপী জেনজি আন্দোলন প্রভাব (সাম্প্রতিক বছর)

দেশআন্দোলনের মূল কারণপ্রধান ফলাফলকাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন
শ্রীলংকা (২০২২)দুর্নীতি, অর্থনৈতিক ধস, কর্তৃত্ববাদী শাসনরাজাপাকসে পরিবারের ক্ষমতা হারানোমধ্যম পর্যায়ের উন্নতি, নির্বাচনী সংস্কার
বাংলাদেশ (২০২৪)দীর্ঘদিনের শাসনের অবসানশেখ হাসিনার পতন, অন্তর্বর্তী সরকারসীমিত, কাঠামোগত সংস্কার কম
নেপাল (২০২৫)দুর্নীতি, ক্ষমতা কেন্দ্রীয়ীকরণকে পি শর্মা অলির পদত্যাগঅর্ধেক; রাজনৈতিক সংস্কার সীমিত
মাদাগাস্কারবিদ্যুৎ, পানি, জ্বালানি সংকটসরকার পতনমূল কাঠামোগত সংস্কার হয়নি
মরক্কোবাজেট সংকোচন, মূল্যস্ফীতিসামাজিক প্রকল্প পুনর্বিবেচনাসীমিত ও আংশিক
ফিলিপাইনশিক্ষা ব্যয়, ঋণ, খাদ্য ও জ্বালানির দামকিছু সামাজিক সহায়তা পুনর্বিবেচনাদুর্নীতি দমন, কর্মসংস্থান সীমিত
ইন্দোনেশিয়াদুর্নীতি, কর, পার্লামেন্ট সুবিধাকিছু সুবিধা বাতিলমূল কাঠামোগত সংস্কার হয়নি
কেনিয়াকর বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, সরকারি ব্যয়কিছু আইন স্থগিত, দুর্নীতির তদন্তমূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থান সমস্যা অব্যাহত
তিমুর-লেস্তেসরকারি ব্যয়, শিক্ষা খাত, জীবনযাত্রাকিছু বরাদ্দ পুনর্বিবেচনাকাঠামোগত সংস্কার সীমিত
পেরু, চিলি, কলম্বিয়াদুর্নীতি, সামাজিক অসমতা, মূল্যস্ফীতিঅল্প কিছু নীতি সংশোধনদীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন সীমিত

বিশ্বব্যাপী তরুণদের মধ্যে এই আন্দোলনের মূল প্রেরণা হল সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট। গ্লোবস্ক্যানের একটি বৈশ্বিক জরিপে দেখা গেছে, জেনারেশন-জেড দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, বেকারত্ব ও শ্রমিক বৈষম্যকে সবচেয়ে মারাত্মক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। জরিপ অনুযায়ী:

  • ৬৪% জেন-জি দুর্নীতিকে অত্যন্ত গুরুতর মনে করে।
  • ৬২% মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
  • ৬০% বেকারত্বকে বড় সংকট হিসেবে দেখছে।

জেন-জি আন্দোলন মূলত এই সমস্যাগুলোকে ‘ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা’ হিসেবে দেখছে। এই গভীর হতাশা ও ক্ষোভ তাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, প্রতিবাদী অবস্থান এবং পরিবর্তনের দাবিকে তীব্র করছে।

জেনজি আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা

বিশ্লেষকরা মনে করেন, অনলাইনভিত্তিক আন্দোলন দ্রুত বিস্তৃত হলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে তারা সীমিত। হার্ভার্ডের রাজনৈতিক বিজ্ঞানী এরিকা চেনোওয়েথ বলেন, যে বৈশিষ্ট্যগুলো নীতিগত পরিবর্তন এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের জন্য জরুরি—সেগুলো অনুপস্থিত। উদাহরণস্বরূপ, আশির দশকের শেষের পোল্যান্ডের ‘সলিডারিটি’ আন্দোলন বা দক্ষিণ কোরিয়ার গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনগুলো শক্তিশালী তৃণমূল নাগরিক প্লাটফর্ম গড়ে তুলেছিল। বর্তমান অনলাইন-ভিত্তিক আন্দোলনগুলো দ্রুত বিস্তৃত হলেও টেকসই পরিবর্তন আনতে পারছে না।

মূল চ্যালেঞ্জ হলো—দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক নেতৃত্ব, আদর্শিক ঐক্য ও শৃঙ্খলা। এই ক্ষেত্রে জেন-জি আন্দোলনের অনেক জায়গায় শূন্যস্থান দ্রুত পুরনো শক্তি পূরণ করছে। ফলে মূল কাঠামোগত সংকট—মূল্যস্ফীতি, দুর্নীতি, বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য—অমীমাংসিত থেকে যাচ্ছে।

দেশভিত্তিক বিশ্লেষণ

নেপাল: ২০২৫ সালে জেন-জি নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে কে পি শর্মা অলি সরকারের পতন ঘটে। তবে তরুণদের কাঠামোগত সংস্কার চাওয়া এখনও সীমিত পর্যায়ে। রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রীয় অংশে পুরনো রাজনৈতিক শ্রেণি অব্যাহত আছে। অর্থনীতির অনিশ্চয়তা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।

মাদাগাস্কার: বিদ্যুৎ, পানি ও জ্বালানি সংকটের কারণে শুরু হওয়া আন্দোলন সরকারের পতনে শেষ হলেও, বিদ্যুৎ-পানি সরবরাহ ও দুর্নীতির ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংস্কার হয়নি।

মরক্কো: ‘জেন-জি ২১২’ আন্দোলন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বাজেট সংকোচন, নতুন কর চাপ, মূল্যস্ফীতি এবং সরকারি ব্যয় অগ্রাধিকারের প্রতি অসন্তোষ থেকে শুরু হয়। সরকার কিছু সামাজিক প্রকল্প পুনর্বিবেচনা করলেও কাঠামোগত সংস্কার সীমিত।

ফিলিপাইন: তরুণরা শিক্ষা ব্যয়, ঋণ, খাদ্য ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক এলিটদের স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। সরকার কিছু সামাজিক সহায়তা পুনর্বিবেচনা করে। তবে কাঠামোগত দুর্নীতি দমন ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বাস্তব উন্নতি সীমিত।

ইন্দোনেশিয়া: ‘১৭+’ রূপান্তরমূলক দাবি নিয়ে আন্দোলন হয়। সরকার পার্লামেন্ট সদস্যদের অতিরিক্ত সুবিধা বাতিল করে এবং বিদেশ ভ্রমণের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করে। মূল কাঠামোগত ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার বাস্তবায়ন হয়নি।

কেনিয়া: নতুন কর আইন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতার সমস্যা নিয়ে আন্দোলন। সরকার কিছু আইন স্থগিত করে, জ্বালানি ও কর ব্যবস্থায় পুনর্বিবেচনার ঘোষণা দেয়, তবে মূল চারটি দাবি—মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, দুর্নীতি দমন ও বাজেট স্বচ্ছতা—আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে।

তিমুরলেস্তে: সরকারি ব্যয়, সংসদ সদস্যদের সুবিধা, শিক্ষা খাত এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে আন্দোলন। বাজেট আইটেমের অডিট ও ব্যাখ্যা শুরু হলেও কাঠামোগত সংস্কার সীমিত।

লাতিন আমেরিকা: পেরু, চিলি ও কলম্বিয়ায় জেন-জি আন্দোলন দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক অসমতার বিরুদ্ধে। সরকার কিছু নীতি সংশোধন করলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন সীমিত।

শ্রীলংকা: ২০২২ সালের গণ-আন্দোলন রাজাপাকসে পরিবারের ক্ষমতা শেষ করে। নতুন সরকার নির্বাচনী সংস্কার এবং প্রেসিডেন্সির ক্ষমতা কমানোসহ বিভিন্ন কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করছে। এটি অন্যান্য দেশে জেন-জি আন্দোলনের জন্য শিক্ষণীয় উদাহরণ।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মতামত

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের গবেষক জশুয়া কারলান্টজিক বলেন, স্পষ্ট নীতিগত রোডম্যাপ ছাড়া আন্দোলনের দাবিকে বাস্তব নীতিতে রূপান্তর করা, রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে কার্যকর নেতৃত্ব স্থাপন করা খুব কঠিন। কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জেন-জি আন্দোলনের মাধ্যমে দুর্নীতি, অর্থনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা সামনে এসেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাত্রা এখনো স্পষ্ট নয়।

উপসংহারঃজেন-জি আন্দোলন তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করেছে এবং সরকার ও নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। তবে কাঠামোগত, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কার এখনও সীমিত। বিশ্বব্যাপী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, শ্রীলংকা ছাড়া অন্য দেশগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল এখনো আংশিক। ২০২৬ সালে এই আন্দোলন আরও বিস্তার লাভ করতে পারে, তবে স্পষ্ট নীতিগত রোডম্যাপ ছাড়া টেকসই পরিবর্তন আনা কঠিন।

জেন-জি আন্দোলনের উদ্ভাবনী শক্তি ও সামাজিক সচেতনতা অবশ্য ভবিষ্যতে বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এই তরুণদের দাবিকে কার্যকর নীতিতে রূপান্তর করতে হলে প্রয়োজন নেতৃত্ব, ধারাবাহিকতা ও কাঠামোগত সংস্কারের সমন্বয়। অন্যথায়, আন্দোলনের প্রাথমিক প্রভাব সাময়িকই থেকে যাবে, এবং পুরনো শক্তিগুলো দ্রুতই শূন্যস্থান পূরণ করবে।