জুলাই আন্দোলনের একাধিক শীর্ষ নেতার নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাজধানীতে সংঘটিত এক ভয়াবহ হামলার পর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে গুরুতর আহত হন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র সংসদপ্রার্থী শরিফ ওসমান বিন হাদি। মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাঁকে দ্রুত এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসাধীন এবং তাঁর অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
হাদির ওপর এই হামলার পর একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসছে। নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন সূত্রের দাবি, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন সহিংস ঘটনা নয়; বরং পূর্বপরিকল্পিত “টার্গেট কিলিং”-এর অংশ। জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই হাদি এবং জুলাই আন্দোলনের আরও কয়েকজন প্রভাবশালী সংগঠক একটি হত্যার তালিকায় ছিলেন। হামলার আগেই সম্ভাব্য প্রাণনাশের আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট সরকারি মহলে জানানো হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে সেই সতর্কবার্তার পরও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এমন অভিযোগও করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র জানায়, কথিত সেই তালিকায় রয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রধান সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ এবং আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ। এছাড়াও জুলাই আন্দোলনের আরও কয়েকজন সক্রিয় নেতার নাম উঠে এসেছে, যাঁদের জীবন নিয়েও তাৎক্ষণিক হুমকির কথা বলা হয়েছিল।
তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী এক আইনজীবীর মাধ্যমে প্রথম এই হুমকির বিষয়টি সামনে আসে। বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে পেশাগত যোগাযোগ থাকার সুবাদে তিনি নাকি সংবেদনশীল গোয়েন্দা তথ্য পান, যেখানে জুলাই আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের হত্যা করার একটি সমন্বিত পরিকল্পনার ইঙ্গিত ছিল। তিনি দ্রুতই সেই তথ্য সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানান। একই সময়ে শরিফ ওসমান হাদি এবং আরও দুইজন জুলাই নেতা ব্যক্তিগতভাবেও নিজেদের ঝুঁকির কথা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন বলে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, “আমরা বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পেয়েছিলাম এবং সরকারকে জানিয়েছিলাম। কিন্তু দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দিলেই এত বড় সংকটের সমাধান হয় না। বর্তমান বাস্তবতায় পুলিশি পাহারায় থেকে মাঠপর্যায়ের রাজনীতি করা প্রায় অসম্ভব।”
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বড় ধরনের অভিযান ও সশস্ত্র অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ থেকেই যাবে। প্রতীকী বা লোক দেখানো অভিযান পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
এদিকে পুলিশ সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে, হাদির ওপর হামলার ঘটনায় বিদেশে অবস্থানরত অপরাধীদের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। সন্দেহভাজন এক ভাড়াটে খুনির নাম—ফিলিপ ওরফে গারো ফিলিপ—উঠে এসেছে। তাকে গ্রেপ্তার করা গেলে পুরো হত্যাচক্রান্তের নেপথ্য কারিগরদের পরিচয় বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।
তবে এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও পুলিশের মহাপরিদর্শকের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। যদিও পুলিশের মহাপরিদর্শক বার্তা পাঠিয়ে জানিয়েছেন, এ ধরনের আগাম গোয়েন্দা তথ্য পুলিশ নাকি পায়নি। পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উৎকণ্ঠা ক্রমেই বাড়ছে।