গাজীপুর মহানগরের নাওজোড় এলাকায় একটি জুতা তৈরির কারখানায় পুলিশ পরিচয়ে প্রবেশ করে শ্রমিকদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করার অভিযোগে দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত রোববার দুপুরে ঘটে যাওয়া এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো শিল্পাঞ্চলে কিছু সময়ের জন্য চরম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দেয়।
গ্রেপ্তার হওয়া দুই ব্যক্তি হলেন বান্দরবানের আলীকদম থানার মিয়াপাড়া এলাকার মো. ইলিয়াস (৪০) এবং মুন্সিগঞ্জের লৌহজং থানার খিদিরপাড়া এলাকার আরিফ আল খোকন (৪০)। পুলিশ জানিয়েছে, তারা একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে ‘পুলিশ’ লেখা স্টিকার লাগিয়ে নিজেদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়ে কারখানার ভেতরে প্রবেশ করেন।
কারখানা কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নাওজোড় এলাকার ‘প্যাসিফিক ফুটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’ নামের প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১৭ বছর ধরে জুতা উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। গত এক বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি একটি চীনা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বিদেশি অংশীদার প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যস্ত ছিল।
তবে সম্প্রতি কারখানার অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা জটিলতার কারণে প্রায় আড়াইশ শ্রমিক সময়মতো বেতন না পাওয়ায় অসন্তোষে ভুগছিলেন। ঈদের আগে কয়েক দফা শ্রমিক বিক্ষোভও হয়। এর মধ্যেই চীনা প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন প্রতিনিধি কারখানা থেকে কিছু মালামাল সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শ্রমিকদের বাধার মুখে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্প পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়।
এরই মধ্যে মো. ইলিয়াস ও আরিফ আল খোকন ‘পুলিশ’ লেখা স্টিকারযুক্ত গাড়িতে করে কারখানায় প্রবেশ করেন এবং নিজেদের পুলিশ সদস্য পরিচয় দেন বলে অভিযোগ ওঠে। দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা তাদের পরিচয়পত্র দেখতে চাইলে তারা কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। এতে সন্দেহ সৃষ্টি হলে বিষয়টি যাচাই শুরু হয় এবং তাদের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
পরবর্তীতে কারখানা কর্তৃপক্ষ জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করলে বাসন থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দুইজনকে আটক করে। এ সময় গাড়িটিও জব্দ করা হয়, যা বর্তমানে তদন্তের অংশ হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।
ঘটনার পর কারখানার মানবসম্পদ কর্মকর্তা শেখ পলাশ আহমেদ বাদী হয়ে বাসন থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় পুলিশ পরিচয়ে প্রতারণা, শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্ন করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম হাসানুজ্জামান দাবি করেছেন, শ্রমিক সংকটকে কেন্দ্র করে একটি স্বার্থান্বেষী মহল কারখানাকে হয়রানির চেষ্টা করছে। তিনি আরও দাবি করেন, জব্দকৃত গাড়িটি শিল্প পুলিশের এক কর্মকর্তার ব্যবহার করা এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের একজন তার পরিচিত।
অন্যদিকে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছেন শিল্প পুলিশের সুপার মো. আমজাদ হোসেন। তিনি বলেন, জব্দ করা গাড়ির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সঙ্গেও তার কোনো পরিচয় নেই।
বাসন থানার পরিদর্শক মো. সেলিম জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ পরিচয়ে প্রবেশের সত্যতা পাওয়া গেছে। গ্রেপ্তার দুইজনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
ঘটনাটি শুধু একটি কারখানার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নয়, বরং পুরো শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক অসন্তোষ, প্রতারণা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সংক্ষিপ্ত তথ্য
| নাম | বয়স | ঠিকানা | অভিযোগ |
|---|---|---|---|
| মো. ইলিয়াস | ৪০ | আলীকদম, বান্দরবান | পুলিশ পরিচয়ে প্রবেশ ও উত্তেজনা সৃষ্টি |
| আরিফ আল খোকন | ৪০ | লৌহজং, মুন্সিগঞ্জ | একই অভিযোগে গ্রেপ্তার |
