জাহাজনির্মাণ শিল্প রক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বড় ঋণ ছাড়

দেশের ব্লু-ইকোনমি বা নীল অর্থনীতির অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত জাহাজনির্মাণ শিল্পকে বৈশ্বিক সংকটের ধাক্কা থেকে বাঁচাতে বড় ধরনের নীতিগত সুবিধা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আজ মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি, ২০২৬) কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জারি করা এক বিশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জানানো হয়েছে, এই খাতের উদ্যোক্তারা এখন থেকে নামমাত্র ডাউনপেমেন্টে দীর্ঘমেয়াদে খেলাপি ঋণ নবায়নের সুযোগ পাবেন। মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজনির্মাণের কার্যাদেশ হ্রাস এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া দেশীয় শিপইয়ার্ডগুলোকে পুনরায় সচল করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

বিশেষ ছাড় ও ঋণ পুনঃ তফসিল সুবিধা

নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, রপ্তানিমুখী ও স্থানীয় জাহাজনির্মাণ শিল্পের উদ্যোক্তারা তাঁদের খেলাপি হয়ে পড়া ঋণ স্থিতির ওপর মাত্র ৩ শতাংশ এককালীন অর্থ (ডাউনপেমেন্ট) জমা দিয়ে ঋণ পুনঃ তফসিল করতে পারবেন। উদ্যোক্তাদের নগদ প্রবাহের সংকট বিবেচনা করে এই ৩ শতাংশ জমা দেওয়ার ক্ষেত্রেও বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে। আবেদনের সময় ১.৫ শতাংশ এবং বাকি ১.৫ শতাংশ পুনঃ তফসিল কার্যকর হওয়ার পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে। যা এই খাতের জন্য একটি অভাবনীয় সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদী পরিশোধ ও গ্রেস পিরিয়ড

কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেবল ডাউনপেমেন্টেই ছাড় দেয়নি, বরং পরিশোধের সময়ের ক্ষেত্রেও ব্যাপক শিথিলতা প্রদর্শন করেছে। পুনঃ তফসিলকৃত ঋণ পরিশোধের জন্য উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত সময় পাবেন। এছাড়া প্রথম দুই বছর ঋণ পরিশোধে ‘বিরতি সুবিধা’ বা গ্রেস পিরিয়ড দেওয়া হবে। অর্থাৎ, প্রথম ২৪ মাস গ্রাহককে ঋণের মূল কিস্তি পরিশোধ করতে হবে না, তবে নিয়মিতভাবে আরোপিত সুদ পরিশোধ করতে হবে।

জাহাজনির্মাণ খাতের বিশেষ ঋণ নীতিমালার মূল দিকসমূহ:

সুবিধার ক্ষেত্রনতুন নীতিমালার শর্তাবলি
প্রাথমিক জমা (ডাউনপেমেন্ট)মোট ঋণের ১.৫% (আবেদনের সময়)
পরবর্তী জমাআরও ১.৫% (কার্যকরের ৬ মাসের মধ্যে)
পরিশোধের সময়সীমাসর্বোচ্চ ১০ বছর
পরিশোধে বিরতি (গ্রেস পিরিয়ড)২ বছর
সুদ ব্যবস্থাপনাস্থগিত সুদ পৃথক ‘ব্লকড’ হিসেবে থাকবে
আবেদনের সময়সীমা৩০ জুন, ২০২৬ পর্যন্ত
নিষ্পত্তির সময়কালআবেদন প্রাপ্তির ৬০ দিনের মধ্যে

কেন এই বিশেষ ব্যবস্থা?

প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ ব্যাংক উল্লেখ করেছে যে, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে ইউরোপে চলমান সামরিক সংঘাত এবং বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত হওয়ার কারণে জাহাজনির্মাণ শিল্পের নগদ প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। যেহেতু এসব পরিস্থিতি উদ্যোক্তাদের নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত, তাই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের টিকিয়ে রাখতে এবং কর্মসংস্থান সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই এই নমনীয় নীতিমালা জারি করা হয়েছে।

শর্ত ও কঠোর নজরদারি

এই সুবিধা ভোগ করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছু কঠোর শর্তও আরোপ করেছে। জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে সৃষ্ট কোনো ঋণ কিংবা ‘ইচ্ছাকৃত খেলাপি’ হিসেবে চিহ্নিত কোনো গ্রাহক এই সুবিধার আওতায় আসবেন না। এছাড়া, ব্যাংকগুলোকে বিশেষ পরিদর্শনের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে যে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি আসলেই বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না। যদি কোনো গ্রাহক নির্ধারিত কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হন, তবে তাঁর ঋণটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে খেলাপি হিসেবে গণ্য হবে এবং ভবিষ্যতে তিনি আর কোনো পুনর্গঠন সুবিধা পাবেন না।

উপসংহার

জাহাজনির্মাণ শিল্পে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নীতিগত ছাড় দেশের রপ্তানি আয়ে নতুন গতি আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আগামী ৩০ জুনের মধ্যে আবেদনের এই সুযোগ গ্রহণ করে অনেক বন্ধ হয়ে যাওয়া শিপইয়ার্ড পুনরায় কাজ শুরু করতে পারবে। এই পদক্ষেপের ফলে হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান সুরক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি দেশের ব্যাংকিং খাতের অনাদায়ী ঋণ আদায়ের পথও সুগম হবে।