জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর নিকট স্মারকলিপি

সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিলের দাবি। ‘সচেতন নাগরিক সমাজ’ নামক একটি সংগঠনের ব্যানারে প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। আজ শুক্রবার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য প্রকাশ করেন সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ।

সংবাদ সম্মেলনের প্রেক্ষাপট ও মূল বক্তব্য

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির সদস্য সচিব এবং বর্তমান সময়ের আলোচিত নারী উদ্যোক্তা ও ইনফ্লুয়েন্সার রোবাইয়াত ফাতিমা তনি। তার সাথে সংগঠনটির আহ্বায়ক নীলা ইসরাফিলসহ অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক কিছু রাজনৈতিক অবস্থান এবং দলটির শীর্ষ নেতাদের নারী নেতৃত্ব বিরোধী বক্তব্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো।

রোবাইয়াত ফাতিমা তনি প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে লেখা চিঠিটি পাঠ করে শোনান। তিনি অভিযোগ করেন যে, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং দলের শীর্ষ নেতারা বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্য জনসভায় ও বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন যে—কোনো নারী দলীয় প্রধান, রাষ্ট্রপ্রধান, রাষ্ট্রপতি কিংবা প্রধান বিচারপতি হতে পারবেন না। জামায়াতের এই ঘোষণাকে তিনি প্রগতিশীল সমাজের জন্য হুমকি হিসেবে অভিহিত করেন।

সাংবিধানিক অধিকার ও আরপিও লঙ্ঘন

সংগঠনটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, জামায়াতের এই ধরনের আদর্শ বাংলাদেশের সংবিধানের মূল চেতনার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। বাংলাদেশের সংবিধান নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করে। বিশেষ করে সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদে সকল নাগরিকের সমান অধিকার এবং বৈষম্যহীনতার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।

প্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO) অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দল যদি লিঙ্গ সমতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় বা এমন কোনো আদর্শ প্রচার করে যা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর বিরোধী, তবে সেই দলের নিবন্ধন বাতিল করার আইনি ভিত্তি তৈরি হয়। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, জামায়াতের এই নারীবিদ্বেষী অবস্থান দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা অর্থাৎ নারীদের রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণের অধিকার কেড়ে নেওয়ার এক চরম অসাংবিধানিক অপচেষ্টা।


যৌক্তিক তুলনামূলক বিশ্লেষণ

জামায়াতে ইসলামীর বিতর্কিত অবস্থান এবং সংবিধানের প্রাসঙ্গিক ধারাগুলোর একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:

বিষয়জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান (দাবি অনুযায়ী)বাংলাদেশের সংবিধান ও আরপিও (RPO)
নারী নেতৃত্বনারী রাষ্ট্রপ্রধান বা শীর্ষ পদে আসীন হতে পারবেন না।অনুচ্ছেদ ২৭: সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান।
লিঙ্গ সমতানেতৃত্বের ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক সীমাবদ্ধতা আরোপ।অনুচ্ছেদ ২৮: কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী বা লিঙ্গের কারণে কোনো বৈষম্য করা যাবে না।
রাজনৈতিক অধিকারনারীদের নীতিনির্ধারণী শীর্ষ পদে বাধার সৃষ্টি।আরপিও অনুযায়ী লিঙ্গ বৈষম্যমূলক নীতি থাকলে নিবন্ধন বাতিলের বিধান রয়েছে।
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিপ্রথাগত ও রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গির প্রচার।আধুনিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র বিনির্মাণের অঙ্গীকার।

সংগঠনের পক্ষ থেকে উত্থাপিত দাবিসমূহ

সংবাদ সম্মেলনে রোবাইয়াত ফাতিমা তনি জোর দিয়ে বলেন, নারীর সম্মান ও সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে কোনো রাজনৈতিক আপস করা চলবে না। সংগঠনটির পক্ষ থেকে তিনটি প্রধান দাবি উত্থাপন করা হয়:

১. নিবন্ধন বাতিল: জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক নিবন্ধন বাতিলের বিষয়টি দ্রুত খতিয়ে দেখে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

২. আইনি বিচার: ডা. শফিকুর রহমানের অবমাননাকর বক্তব্যের জন্য প্রচলিত আইনে তার বিচার নিশ্চিত করা এবং তাকে প্রকাশ্য ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা।

৩. কঠোর অবস্থান: নারীর প্রতি বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও প্রচারণার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।

বক্তারা আরও বলেন, বর্তমান সরকার যখন নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে বিশ্বমঞ্চে প্রশংসিত হচ্ছে, তখন এমন অন্ধকারাচ্ছন্ন আদর্শ দেশের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তারা আশা প্রকাশ করেন, প্রধানমন্ত্রী দ্রুত এই চিঠির প্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।