জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে (জাবি) একটি প্লাস্টিকমুক্ত ও সবুজ ক্যাম্পাস হিসেবে গড়ার লক্ষ্যে এক ব্যতিক্রমী পরিবেশবান্ধব কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ‘প্লাস্টিক বর্জ্য ত্যাগ করি, সবুজ ক্যাম্পাস গড়ি’—এই প্রত্যয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান ও উপাত্ত বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ইফরাত আমিন (অক্ষর) এক অভিনব প্রচারণা শুরু করেছেন। এই কর্মসূচির মূল আকর্ষণ হলো—শিক্ষার্থীরা তাদের সংগ্রহ করা পরিত্যক্ত প্লাস্টিক বর্জ্য জমা দিয়ে বিনিময়ে পাচ্ছেন একটি করে জীবন্ত চারাগাছ।
Table of Contents
কার্যক্রমের পটভূমি ও উদ্দেশ্য
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পর্যটক ও শিক্ষার্থীর সমাগম ঘটে। ফলে ক্যাম্পাসের যত্রতত্র প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট ও পলিথিন জমে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এই সমস্যার সমাধানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বৃক্ষরোপণে উদ্বুদ্ধ করতেই ইফরাত আমিন এই কর্মসূচি হাতে নেন। গত সোমবার থেকে শুরু হয়ে বুধবার বিকেল পর্যন্ত চলা এই অভিযানে শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা গেছে।
কর্মসূচির পরিসংখ্যান ও অর্জন
গত তিন দিনের এই কার্যক্রমে সংগৃহীত বর্জ্য এবং বিতরণকৃত চারার একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
| বিষয় | বিবরণ |
| বিনিময় হার | ১০টি প্লাস্টিক বর্জ্য = ১টি চারাগাছ |
| মোট সংগৃহীত বর্জ্য | ৩,০০০টিরও বেশি প্লাস্টিক সামগ্রী |
| মোট বিতরণকৃত চারা | ৩০০টি |
| প্রধান অংশগ্রহণকারী | সাধারণ শিক্ষার্থী ও পরিবেশকর্মী |
| লক্ষ্য | প্লাস্টিকমুক্ত ক্যাম্পাস ও বনায়ন বৃদ্ধি |
পরিবেশ রক্ষায় সম্মিলিত আহ্বান
উদ্যোক্তা ইফরাত আমিনের মতে, কেবল আইন করে বা ডাস্টবিন বসিয়ে ক্যাম্পাস পরিষ্কার রাখা সম্ভব নয়, যদি না শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। তিনি বলেন, “আমরা প্রতিনিয়ত ক্যাম্পাসকে দূষিত করছি। এই চারাগাছ বিতরণের মাধ্যমে আমি বার্তা দিতে চেয়েছি যে, প্লাস্টিক বর্জ্য প্রকৃতির জন্য অভিশাপ, আর গাছ হলো আশীর্বাদ। শিক্ষার্থীরা যখন ১০টি বোতল কুড়িয়ে আনছে, তখন তারা বুঝতে পারছে বর্জ্য পরিষ্কার করা কতটা শ্রমসাধ্য।”
সুধী সমাজের প্রশংসা
এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী এবং জাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক আহসান লাবিব এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি মনে করেন, এমন সৃজনশীল কাজ শিক্ষার্থীদের মানসিকতা পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখবে।
অন্যদিকে, পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক জামালউদ্দিন বলেন, “প্লাস্টিক বর্জ্য মাটির জৈব গুণাগুণ নষ্ট করে এবং ভূগর্ভস্থ পানির প্রবাহে বাধা দেয়। একজন শিক্ষার্থীর হাত ধরে এমন সচেতনতামূলক কাজ শুরু হওয়া আমাদের জন্য আশাব্যঞ্জক। এই ছোট ছোট পদক্ষেপই ভবিষ্যতে বড় পরিবর্তনের সূচনা করবে।”
উপসংহার
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ক্ষুদ্র উদ্যোগটি বর্তমানে সারা দেশে পরিবেশ সচেতনতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিত্যক্ত প্লাস্টিক বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করার এই প্রক্রিয়া যদি স্থায়ী রূপ পায়, তবে দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই প্লাস্টিকমুক্ত সবুজাভ চত্বরে পরিণত হবে। ইফরাত আমিনের এই উদ্যোগ কেবল ৩০০ চারা বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি পরিবেশ সংরক্ষণের একটি শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলনের বীজ বপন করেছে।
