জানেন কি ঢাকা মোট কতবার রাজধানী হয়েছে?

বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা ঢাকা কেবল একটি শহর নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী। ৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই শহরটি ক্ষমতার পালাবদল, রাজনৈতিক উত্থান-পতন এবং সংস্কৃতির বিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু। একটি সাধারণ মফস্বল শহর থেকে আজকের মেগাসিটিতে রূপান্তরিত হওয়ার পথে ঢাকা মোট পাঁচবার রাজধানীর মর্যাদা লাভ করেছে।

স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী হওয়ার পূর্বে ঢাকা ১৬১০, ১৬৬০, ১৯০৫ এবং ১৯৪৭ সালে মোট চারবার বাংলার বা একটি প্রদেশের রাজধানী ছিল। নিচে এই ঐতিহাসিক পর্যায়ক্রম বা টাইমলাইন বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. ১৬১০ সাল: মুঘল আমল ও ‘জাহাঙ্গীরনগর’

ঢাকার রাজধানী হওয়ার ইতিহাসের সূচনা হয় মুঘল সুবেদার ইসলাম খান চিশতী-র হাত ধরে। সপ্তদশ শতকের শুরুর দিকে তিনি বাংলার সুবেদার নিযুক্ত হন। সে সময় বাংলার রাজধানী ছিল রাজমহল। কিন্তু বারো ভূঁইয়াদের দমন এবং মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের হাত থেকে বাংলাকে রক্ষা করার জন্য তিনি সামরিক কৌশল হিসেবে রাজধানী পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন।

১৬১০ সালে তিনি রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন। তৎকালীন মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামানুসারে তিনি এই নতুন রাজধানীর নাম রাখেন জাহাঙ্গীরনগর’। এটিই ছিল ঢাকার প্রথম রাজধানী হওয়ার ইতিহাস।

২. ১৬৬০ সাল: মীর জুমলার পুনরুদ্ধার

১৬৩৯ সালে শাহ সুজা যখন বাংলার সুবেদার হন, তিনি ব্যক্তিগত কারণে রাজধানী আবার রাজমহলে ফিরিয়ে নিয়ে যান। ফলে ঢাকা তার জৌলুস কিছুটা হারায়। তবে এই অবস্থা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

১৬৬০ সালে সুবেদার মীর জুমলা আবারও ঢাকাকে বাংলার রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর শায়েস্তা খানের আমলে ঢাকা তার স্বর্ণযুগ পার করে। এ সময় ব্যবসা-বাণিজ্য, স্থাপত্য এবং সংস্কৃতির অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটে। ১৭১৭ সালে মুর্শিদকুলী খান রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরের আগ পর্যন্ত ঢাকাই ছিল মুঘল বাংলার প্রাণকেন্দ্র।

৩. ১৯০৫ সাল: বঙ্গভঙ্গ ও নতুন প্রদেশের রাজধানী

মুঘল আমলের প্রায় ২০০ বছর পর, ব্রিটিশ শাসনামলে ঢাকা তৃতীয়বারের মতো রাজধানীর মর্যাদা পায়। লর্ড কার্জনের সময়ে ১৯০৫ সালে প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে বাংলাকে ভাগ করা হয়, যা ইতিহাসে ‘বঙ্গভঙ্গ’ নামে পরিচিত।

এই বিভাজনের ফলে পূর্ববঙ্গ আসাম’ নামে একটি নতুন প্রদেশ গঠিত হয় এবং ঢাকা হয় সেই প্রদেশের রাজধানী। এই স্বল্পস্থায়ী রাজধানীর মর্যাদাই ঢাকাকে আধুনিক রূপ দিতে সাহায্য করে। আজকের কার্জন হল, হাইকোর্ট ভবন এবং রমনা এলাকার উন্নয়ন মূলত এই সময়েই শুরু হয়েছিল। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলে ঢাকা পুনরায় তার মর্যাদা হারায়।

৪. ১৯৪৭ সাল: পাকিস্তান আমল

১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ব্রিটিশ ভারত ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামের দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পাকিস্তান ছিল দুটি অংশে বিভক্ত—পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ)।

১৯৪৭ সালে ঢাকা পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে ঘোষিত হয়। এটি ছিল ঢাকার চতুর্থবার রাজধানী হওয়া। এই সময়েই ঢাকা কেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ ঘটে এবং ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সমস্ত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সূতিকাগার হয়ে ওঠে এই শহর।

৫. ১৯৭১ সাল: স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী

সর্বশেষ এবং সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়টি রচিত হয় ১৯৭১ সালে। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে স্থান করে নেয়।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের মাধ্যমে ঢাকা পঞ্চমবারের মতো রাজধানী হওয়ার গৌরব অর্জন করে। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। আগের চারবার ঢাকা ছিল কোনো সুবা বা প্রদেশের রাজধানী, কিন্তু এবার ঢাকা হলো একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাজধানী

১৬১০ সালের ছোট্ট জনপদ থেকে আজকের জনাকীর্ণ মহানগর—ঢাকার এই রূপান্তরের পেছনে রয়েছে এই পাঁচবার রাজধানী হওয়ার ইতিহাস। মুঘলদের তলোয়ারের ঝনঝনানি, ব্রিটিশদের কলমের খোঁচা, আর বাঙালির রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা—সবকিছুর নীরব সাক্ষী আমাদের এই ঢাকা।