বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বার্থে সরকার যে কোনো দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বা শিল্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে অন্য কোনো দেশের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বা প্রতিক্রিয়াকে প্রাধান্য দেওয়ার অবকাশ নেই বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। বুধবার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ড্রোন কারখানা নির্মাণে চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে ভারতের সংবাদমাধ্যমের উদ্বেগের প্রেক্ষিতে তিনি এই কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন।
জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ যদি অন্য কোনো দেশের কারিগরি বা আর্থিক সহযোগিতায় নিজস্ব কোনো শিল্প বা কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করে, তবে সেটি সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ ও প্রয়োজনেই করা হবে। তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, ভারত বা পাকিস্তানে যখন কোনো উন্নয়নমূলক কাজ বা কারখানা স্থাপিত হয়, সেখানে যেমন বাংলাদেশের মতামতের কোনো গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা থাকে না, তেমনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন ও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে অন্য কোনো দেশের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়ার কারণ নেই।
উপদেষ্টা আরও যোগ করেন, “বাংলাদেশ যদি নিজের স্বার্থে কোনো ফ্যাক্টরি বা ইন্ডাস্ট্রি করার চিন্তা করে, তবে তা নিজের সিদ্ধান্তেই করবে। এ ক্ষেত্রে অন্য কে কী মনে করছে বা কে বিরূপ মন্তব্য করছে, তাতে বাংলাদেশের কিছু যায় আসে না।” তাঁর এই বক্তব্যের মাধ্যমে এটি পরিষ্কার যে, বর্তমান সরকার বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’—এই নীতির পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
ড্রোন কারখানা ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি
সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, বাংলাদেশ ও চীন যৌথভাবে একটি ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা করছে। এই খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পর ভারতের কিছু সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষক মহলে নিরাপত্তার প্রশ্নে উদ্বেগ দেখা দেয়। তবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বিষয়টিকে বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে দেখছেন।
নিচে ড্রোন প্রযুক্তি ও বাংলাদেশের সম্ভাব্য অবস্থানের একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা তুলে ধরা হলো:
| প্রসঙ্গের বিবরণ | বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান ও উদ্দেশ্য |
| শিল্প স্থাপনের উদ্দেশ্য | প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিক প্রযুক্তির দেশীয় উৎপাদন নিশ্চিত করা। |
| বৈদেশিক সহযোগিতা | প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সাধনে চীন বা অন্য যে কোনো যোগ্য দেশের সঙ্গে অংশীদারিত্ব। |
| আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট | প্রতিবেশী দেশগুলোর নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মতো বাংলাদেশেরও অধিকার রয়েছে। |
| কূটনৈতিক অবস্থান | দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থই হবে মূল মানদণ্ড। |
| উদ্বেগ নিরসন | অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য রাষ্ট্রের অযাচিত হস্তক্ষেপ বা নেতিবাচক ধারণাকে উপেক্ষা করা। |
স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন
পররাষ্ট্র উপদেষ্টার এই মন্তব্যকে বিশ্লেষকরা একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। ড্রোন বর্তমান বিশ্বের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি, যা কেবল প্রতিরক্ষা নয়, কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং নজরদারির ক্ষেত্রেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। বাংলাদেশ এই প্রযুক্তিতে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করলে তা দেশের অর্থনৈতিক ও কারিগরি ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের বক্তব্যে এটিও ফুটে উঠেছে যে, বাংলাদেশ এখন থেকে কোনো বিশেষ শক্তির প্রভাবে নয়, বরং নিজের প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুযায়ী বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান নির্ধারণ করবে। বৈদেশিক বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং জাতীয় নিরাপত্তাকেই প্রধান শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
সবশেষে, পররাষ্ট্র উপদেষ্টার এই দৃঢ় অবস্থান দেশের সাধারণ জনগণের মধ্যে আস্থার সঞ্চার করেছে যে, বর্তমান সরকার জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং স্বার্থ রক্ষায় যে কোনো চাপ মোকাবিলা করতে প্রস্তুত।
