আজ ১৬ ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ স্মরণীয় দিন। এই দিনে ১৯৯২ সালে আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অগ্রদূত, জাতীয় বীর কাজী আরেফ আহমেদ নিহত হন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল চরিত্র—মুক্তিযুদ্ধের অগ্রসৈনিক, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর প্রতিষ্ঠাতা, সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় নেতা এবং সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্নদ্রষ্টা। আজ তার মৃত্যু দিবসে আমরা গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করি তাঁর জীবন ও অবদান।
Table of Contents
ষাটের দশক: আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের তত্ত্বগঠন
ষাটের দশকে পাকিস্তানি শাসনের বৈষম্য, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এবং রাজনৈতিক দমননীতির বিরুদ্ধে আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকশিত হতে শুরু করে। এই প্রেক্ষাপটে কাজী আরেফ আহমেদ জাতীয়তাবাদের তাত্ত্বিক বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি স্বাধীন রাষ্ট্রের কেবল ভূখণ্ডগত মুক্তি নয়, বরং শোষণমুক্ত ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের স্বপ্ন দেখতেন।
মুক্তিযুদ্ধ ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শ
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় কাজী আরেফ আহমেদ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি, গণসংগ্রামের কৌশল এবং সমাজতান্ত্রিক আদর্শের প্রসারে সক্রিয় ছিলেন। স্বাধীনতার পর তিনি বিপ্লবী জাতীয় সরকারের প্রস্তাব দেন, যা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার আহ্বান। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠন ও বিপ্লবী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির ভিত্তি স্থাপন করেন।
১৯৭৫ পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা
১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এবং ৭ নভেম্বরের ঘটনার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে যায়। পাকিস্তানপন্থী ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির পুনরুত্থানের মধ্যে কাজী আরেফ আহমেদ মুক্তিযুদ্ধপন্থী শক্তির “প্রধান দ্বন্দ্ব” নতুনভাবে চিহ্নিত করেন।
| বছর | রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড | লক্ষ্য ও অবদান |
|---|---|---|
| ১৯৭৯ | ১০-দলীয় জোট গঠন | মুক্তিযুদ্ধপন্থী শক্তির ঐক্য |
| ১৯৮৩ | ১৫-দলীয় জোট গঠন | সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনের নেতৃত্ব |
| ১৯৯২ | জাতীয় সমন্বয় কমিটি ও গণআদালত গঠন | যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রাথমিক ব্যবস্থা |
গণআদালত ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা
১৯৯২ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বাস্তবায়ন এবং একাত্তরের ঘাতক-দালালদের বিচারের দাবিতে জাতীয় সমন্বয় কমিটি ও গণআদালত গঠন করেন। এই পদক্ষেপ ছিল রাষ্ট্রীয় নীরবতার বিরুদ্ধে জনমতের প্রকাশ, যা পরবর্তীতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পথ সুগম করে।
সাম্প্রদায়িকতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে অবস্থান
কাজী আরেফ আহমেদ আজীবন সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, সামন্তবাদ ও ঔপনিবেশিক মানসিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রগতিশীল রাজনীতির ধারক ছিলেন। তাঁর মতে রাজনীতি কেবল ক্ষমতার প্রশ্ন নয়, বরং চেতনা, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার রক্ষার বিষয়।
তিন যুগের সংগ্রামী নেতা
কাজী আরেফ আহমেদ ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক পুনর্গঠন, সামরিক শাসনবিরোধী গণআন্দোলন এবং নব্বইয়ের গণতান্ত্রিক উত্তাল সময়ে অব্যাহত সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। তাঁর রাজনীতি ছিল তাত্ত্বিক দৃঢ়তা ও মাঠের সাহসের অনন্য সমন্বয়।
শ্রদ্ধাঞ্জলি
জাতীয় বীর কাজী আরেফ আহমেদ আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন—স্বাধীনতা অর্জন করা মাত্র যথেষ্ট নয়, তার চেতনা রক্ষা ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শ বাস্তবায়ন চিরন্তন সংগ্রামের মাধ্যমে সম্ভব। আজ আমরা তাঁর আত্মত্যাগ এবং দূরদর্শী নেতৃত্বকে গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করি। তাঁর স্বপ্ন—একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ—আমাদের পথচলার অনুপ্রেরণা হয়ে থাকুক।
