বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও প্রগতিশীল চিন্তাধারার ইতিহাসে জহুর হোসেন চৌধুরীর নাম এক উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। দেশ, সমাজ ও মানুষের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা থেকে তিনি কলম তুলে নেন, এবং সেই কলমই তাঁকে পরিণত করেছিল সত্য অনুসন্ধানী ও নির্ভীক কণ্ঠে। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ এবং রাজনৈতিক সচেতনতার সমন্বয়ে তাঁর লেখাগুলি যুগে যুগে পাঠকের আস্থা অর্জন করেছে।
জহুর হোসেন চৌধুরী ১৯২২ সালের ২৭ জুন চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় যেয়ে ১৯৪২ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইতিহাসে অনার্সসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি প্রগতিশীল রাজনীতি ও সাহিত্যচর্চার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
সাংবাদিকতার প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ তাঁকে প্রথমে কলকাতার খ্যাতনামা পত্রিকা দ্য স্টেটসম্যান-এ নিয়ে যায়। এরপর তিনি কাজ করেন দৈনিক আজাদ ও ইংরেজি সাপ্তাহিক কমরেড-এ। দেশ বিভাগের পর ঢাকায় ফিরে তিনি ইংরেজি দৈনিক পাকিস্তান অবজারভার-এ যোগ দেন। তবে তাঁর দীর্ঘতম ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়টি লেখা হয় দৈনিক সংবাদ-এ।
১৯৫৪ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত তিনি দৈনিক সংবাদ-এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে তাঁর প্রখর কলম পাকিস্তানি রাষ্ট্রযন্ত্রের অপতৎপরতা, রাজনৈতিক প্রহসন এবং বৈষম্যের চিত্র উন্মোচন করে। তাঁর বিশ্লেষণী দক্ষতা, নির্ভীক অবস্থান এবং মানবমুখী দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে এক অনন্য সম্পাদক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তাঁর লেখা সম্পাদকীয় ছিল সাহস, সত্য ও ন্যায়ের দীপ্যমান দলিল।
স্বাধীনতার পর সংবাদ-এ প্রকাশিত তাঁর নিয়মিত কলাম ‘দরবারে জহুর’ তাঁকে এনে দেয় ব্যাপক জনপ্রিয়তা। ব্যঙ্গ, তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ এবং বুদ্ধিদীপ্ত উপস্থাপনায় তিনি সমকালীন সমাজ ও রাজনীতির অন্ধকারকে চিহ্নিত করেছেন অসাধারণ দক্ষতায়।
জহুর হোসেন চৌধুরী ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি, পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং ঢাকা প্রেসক্লাবের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। এছাড়া তিনি প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক নানা সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
সাংবাদিকতায় অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ১৯৮১ সালে জেবুন্নেসা–মাহবুবউল্লাহ স্বর্ণপদক এবং ১৯৮২ সালে মরণোত্তর একুশে পদক লাভ করেন।
১৯৮০ সালের ১১ ডিসেম্বর তিনি পৃথিবী ছেড়ে যান। তবে তাঁর লেখা, চিন্তা, সাহস এবং মানবিকতা আজও সাংবাদিকদের অনুপ্রেরণা জোগায়। জহুর হোসেন চৌধুরী কেবল একজন সম্পাদক নন; তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চকিত এক কণ্ঠ, গণমানুষের প্রতিনিধি এবং সত্যের সংগ্রামী সৈনিক। তাঁকে স্মরণ করা মানে দেশের প্রগতিশীল চেতনা ও মুক্তবুদ্ধির ধারাকে জীবন্ত রাখা।