জয়পুরহাটে ঘরে ঢুকে নৃশংস হামলা, নারী নিহত—স্কুলছাত্রী ভাতিজি আশঙ্কাজনক

জয়পুরহাট সদর উপজেলার চিরলা গ্রামে গভীর রাতে ঘরে ঢুকে এক নারীকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা স্থানীয়ভাবে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। এই হামলায় নিহত হয়েছেন ৫০ বছর বয়সী নুরুন নাহার বেগম এবং তাঁর সঙ্গে থাকা ভাতিজি, স্কুলছাত্রী খাদিজা বেগম গুরুতর আহত হয়েছেন। মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) দিবাগত রাতে সংঘটিত এই ঘটনায় এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ উদ্‌ঘাটনে তদন্ত শুরু হয়েছে।

নিহত নুরুন নাহার বেগম জয়পুরহাট সদর উপজেলার চিরলা গ্রামের বাসিন্দা এবং তিনি আব্দুল গফুরের সাবেক স্ত্রী। আহত খাদিজা বেগম (১৬) নুরুন নাহারের ভাতিজি এবং আব্দুল মতিনের মেয়ে। সে স্থানীয় পল্লীবালা বালিকা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী। বয়স কম হলেও এই নির্মম ঘটনার শিকার হয়ে সে বর্তমানে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে।

গভীর রাতে হামলার ভয়াবহতা

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গভীর রাতে একাধিক দুর্বৃত্ত নুরুন নাহার বেগমের ঘরে ঢুকে অতর্কিত হামলা চালায়। লোহার রডসহ ভারী বস্তু দিয়ে তাঁকে মারধর করা হয়। একই সময় ঘরে উপস্থিত থাকা খাদিজা বেগমও হামলার শিকার হয়। দুর্বৃত্তরা কাউকে রেহাই না দিয়ে দুজনকেই গুরুতরভাবে জখম করে পালিয়ে যায়।

আহত অবস্থায় পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা দ্রুত দুজনকে উদ্ধার করে জয়পুরহাট ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই নুরুন নাহার বেগমের মৃত্যু হয়। খাদিজার অবস্থার অবনতি হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। বর্তমানে সে সেখানে নিবিড় চিকিৎসাধীন রয়েছে।

পরিবারের ভাষ্য

নিহতের ভাই এবং খাদিজার বাবা আব্দুল মতিন জানান, রাত আনুমানিক ৩টার দিকে তিনি ছোট ভাইয়ের স্ত্রী মীম আক্তারের ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে যান। সেখানে গিয়ে তিনি দেখতে পান, তাঁর বোন নুরুন নাহার বেগম রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন এবং তাঁর মেয়েও মারাত্মকভাবে আহত। তাঁর দাবি, টিউবওয়েলের হাতলসহ ভারী বস্তু দিয়ে আঘাত করে এই হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে।

আব্দুল মতিন আরও বলেন, “আমার বোনের সঙ্গে কারও এমন শত্রুতা ছিল বলে আমরা জানতাম না। কারা কেন এমন করল, আমরা এর সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”

পুলিশের বক্তব্য ও তদন্ত

জয়পুরহাট সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল কাদের জানান, নুরুন নাহার বেগমের মরদেহের ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়া চলছে। প্রাথমিকভাবে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, আহত খাদিজা বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হামলার প্রকৃত কারণ ও হামলাকারীদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। এখনো আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের হয়নি, তবে পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হবে বলে তারা জানিয়েছে। পুলিশ ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলছে।

স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া

এলাকাবাসীর মধ্যে এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। তারা বলছেন, গ্রামবাংলার মতো এলাকায় এ ধরনের নৃশংস হামলা নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। অনেকেই রাতের বেলায় টহল জোরদার এবং দ্রুত দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন।

ঘটনার সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্র

বিষয়বিবরণ
ঘটনা স্থানচিরলা গ্রাম, জয়পুরহাট সদর
ঘটনা সময়মঙ্গলবার গভীর রাত (২ ডিসেম্বর)
নিহতনুরুন নাহার বেগম (৫০)
আহতখাদিজা বেগম (১৬), দশম শ্রেণির ছাত্রী
ব্যবহৃত অস্ত্রলোহার রড ও ভারী বস্তু
চিকিৎসাজয়পুরহাট ও বগুড়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
আইনগত অবস্থাতদন্ত চলমান, মামলা প্রক্রিয়াধীন

বিশ্লেষকদের মতে, এমন হত্যাকাণ্ড কেবল একটি পরিবারের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্যই অশনিসংকেত। নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি, দ্রুত বিচার এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। জয়পুরহাটের এই ঘটনায় প্রশাসনের তৎপরতা কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।