নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ পদগুলিতে ব্যাপক রদবদলের ধারা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে জনপ্রশাসন, পুলিশ ও শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে নতুন নিয়োগ, বদলি এবং পদায়নের পুনর্বিন্যাস চোখে পড়ার মতো। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) পদে ইতিমধ্যেই নতুন নিয়োগ কার্যকর হয়েছে।
চুক্তিভিত্তিক পদে থাকা ৯ জন সচিব ও জ্যেষ্ঠ সচিবের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি কিছু সচিবকে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য হওয়ার কারণে প্রশাসনে বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, এটি পরিবর্তনের প্রথম ধাপ এবং ভবিষ্যতে আরও পদক্ষেপ আসতে পারে।
Table of Contents
সচিব ও সমপর্যায়ের পদ শূন্য
বর্তমানে অন্তত ১২টি সচিব ও সমপর্যায়ের পদ শূন্য রয়েছে। জেলা প্রশাসক (ডিসি) পর্যায়েও পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতেও ধাপে ধাপে পরিবর্তন আসতে পারে।”
গতকাল সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সচিব মো. আবদুর রহমান তরফদারকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে বদলি করা হয়েছে। শ্রম সচিব মো. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়াকে পিএসসির সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অবসরপ্রাপ্ত সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
নতুন সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার, যিনি আগে বিএনপি চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব ছিলেন।
জনপ্রশাসনে পদায়ন ও প্রথম ধাপের রদবদল
সরকার গঠনের এক সপ্তাহের মধ্যেই জনপ্রশাসনে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তিন সচিবকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন:
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. সাইফুল্লাহ পান্না
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীন
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামাল উদ্দিন
চুক্তিতে থাকা নয়জন সচিব ও জ্যেষ্ঠ সচিবের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করা হয়েছে। এর আগে মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আবদুর রশীদ এবং প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া স্বেচ্ছায় পদ থেকে সরে যান। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব নাসিমুল গনিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
পুলিশ নেতৃত্বে পরিবর্তন
পুলিশ বাহিনীতেও নতুন নিয়োগ কার্যকর হয়েছে। আলী হোসেন ফকিরকে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক থেকে মহাপরিদর্শক (আইজিপি) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার পদেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।
শিক্ষা প্রশাসনে নতুন সমীকরণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়াজ আহমদ খান অব্যাহতির আবেদন করেছেন। নতুন উপাচার্য নিয়োগের প্রস্তুতি চলছে। দেশের প্রায় অর্ধশত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদেও পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পদ, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান পদ দীর্ঘদিন শূন্য। এসব পদে দ্রুত নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পদায়ন ও নিয়োগের দিকনির্দেশনা
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান বলেন, “নতুন সরকারের অধীনে পদায়ন স্বাভাবিক। তবে মেধা, যোগ্যতা এবং নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, কখনও কখনও অনুপযুক্ত প্রভাবের কারণে যোগ্য কর্মকর্তা বঞ্চিত হন। এবার এমন পরিস্থিতি এড়াতে পদায়নে সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।”
বর্তমানে শূন্য ও নতুন নিয়োগকৃত পদসমূহ
| বিভাগ | পদ | বর্তমান অবস্থা | নতুন নিয়োগ/বদলি |
|---|---|---|---|
| জনপ্রশাসন | সচিব/জ্যেষ্ঠ সচিব | ১২টি শূন্য | পদায়ন চলমান |
| পুলিশ | মহাপরিদর্শক (আইজিপি) | নতুন নিয়োগ | আলী হোসেন ফকির পদোন্নত |
| শিক্ষা | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য | পদ শূন্য | নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে |
| শিক্ষা | মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর মহাপরিচালক | শূন্য | নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু |
| জাতীয় রাজস্ব বোর্ড | সিআইসি মহাপরিচালক | নতুন নিয়োগ | মোহাম্মদ আবদুর রকিব নিয়োগ |
নতুন সরকারের লক্ষ্য হলো প্রশাসন, পুলিশ ও শিক্ষা খাতে স্থিতিশীল, যোগ্য এবং নিরপেক্ষ নেতৃত্ব নিশ্চিত করা, যাতে রাষ্ট্রযন্ত্রের দক্ষতা ও জনসেবার মান উন্নত হয়।
এই পুনর্বিন্যাসের ফলে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা ও শিক্ষা খাতে একটি নতুন সমীকরণ গড়ে উঠার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, যা আগামী মাসগুলোতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
