লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও স্থানীয় জনতার মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় পুলিশের চার সদস্যসহ অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন। উত্তেজিত জনতা প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা লক্ষ্মীপুর–রায়পুর আঞ্চলিক সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করলে সড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির মুখে পড়েন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যার দিকে উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের হায়দর আলী বেপারী বাড়ির বাসিন্দা শাহ আলম তার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাটি রাস্তার পাশে রেখে পাশের একটি বাড়িতে ইফতার করতে যান। কয়েক মিনিট পর ফিরে এসে তিনি দেখতে পান অটোরিকশাটি আর সেখানে নেই। বিষয়টি জানতে পেরে স্থানীয় লোকজন দ্রুত আশপাশে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। কিছু সময়ের মধ্যেই সন্দেহভাজন চারজনকে আটক করা হয় এবং কাছাকাছি এলাকা থেকে অটোরিকশাটিও উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অটোরিকশাটি উদ্ধার হলেও এর ব্যাটারিগুলো আগেই খুলে অন্যত্র বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। ব্যাটারি উদ্ধারের দাবিতে এলাকাবাসী আটক ব্যক্তিদের একটি বাড়িতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে এবং একপর্যায়ে তাদের মারধরও করা হয়। এ ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
রাত প্রায় ৯টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এ ফোন পেয়ে রায়পুর থানা পুলিশের একটি টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে। পুলিশ আটক চারজনকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে স্থানীয়রা বাধা দেন। তাদের দাবি ছিল, চুরি হওয়া ব্যাটারি উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত সন্দেহভাজনদের ছেড়ে দেওয়া যাবে না। এ নিয়ে পুলিশ ও এলাকাবাসীর মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয় এবং একপর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠলে উভয়পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
সংঘর্ষে পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মোতালেব, কনস্টেবল শওকত, মঞ্জুর ও জাহিদসহ অন্তত ২৫ জন আহত হন। আহত পুলিশ সদস্যদের রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় কয়েকজন আহত ব্যক্তি বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
সংঘর্ষের পর পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে সরে গেলে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী লক্ষ্মীপুর–রায়পুর আঞ্চলিক সড়কের চৈতাইল্যা দিঘির পাড় এলাকায় সড়ক অবরোধ করে। তারা সড়কের ওপর টায়ার ও গাছের গুঁড়ি ফেলে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। রাত প্রায় ১১টা থেকে শুরু হয়ে দেড়টা পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা অবরোধ চলতে থাকে। এর ফলে সড়কের দুই পাশে প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় যানজট সৃষ্টি হয় এবং যাত্রীবাহী যানবাহন ও পণ্যবাহী ট্রাক আটকে পড়ে।
স্থানীয় অটোরিকশাচালক মো. আকবর জানান, ব্যাটারি উদ্ধারের জন্য এলাকাবাসী চোরদের আটক করে রেখেছিল। কিন্তু পুলিশ এসে জোর করে তাদের নিয়ে যেতে চাইলে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। বাধা দেওয়ার পর ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে এবং কয়েকজন আহত হন।
অন্যদিকে পুলিশের দাবি, তারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ঘটনাস্থলে গিয়ে আটক ব্যক্তিদের থানায় নিয়ে আসার চেষ্টা করলে কিছু লোক পেছন থেকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে পুলিশের কয়েকজন সদস্য আহত হন।
রায়পুর ও রামগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জামিলুল হক জানান, আটক চার সন্দেহভাজন বর্তমানে রায়পুর থানা হেফাজতে রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে অটোরিকশা চুরির ঘটনায় ভুক্তভোগী মালিককে মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পুলিশের ওপর হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় পৃথক মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।
তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অতিরিক্ত পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। পরে স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সড়ক অবরোধ তুলে নেওয়া সম্ভব হয়। বর্তমানে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে, তবে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত নজরদারি বজায় রাখা হয়েছে।