চিরনিদ্রায় প্রস্থান করলেন ‘টেলিগ্রাম যুগের’ শেষ নায়ক রণজিৎ দাস

সিলেটের পাহাড়ি রাস্তার এক নীরব সকালে শেষ হলো এক যুগের ক্রীড়াবিদ জীবনের অধ্যায়। ৯৩ বছর বয়সে কিংবদন্তি গোলকিপার ও মাল্টি-ট্যালেন্টেড ক্রীড়াবিদ রণজিৎ দাস আজ চিরতরে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। আজ সকাল ৬টা ৫৫ মিনিটে তিনি সিলেটের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

ফুটবল ও হকির মাঠে রণজিৎ দাস ছিলেন এক সময়কার অনবদ্য নায়ক। ১৯৫৫ সালে ইস্পাহানি ক্লাবের হয়ে ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন, পরবর্তীতে আজাদ স্পোর্টিংয়ের হয়ে খেলেন। ১৯৫৮ সালে অধিনায়কত্বে আজাদ স্পোর্টিং লিগ শিরোপা জিতেছিল। এছাড়া ১৯৫৭ সালে তিনি কলকাতা মোহামেডানের হয়ে অল ইন্ডিয়া ডুরান্ড কাপ খেলেছেন। মাঠের মধ্যে তার উদ্যম, নিষ্ঠা এবং নেতৃত্বের জন্য আজও তাকে স্মরণ করা হয়।

রণজিৎ দাস শুধু খেলোয়াড়ই ছিলেন না, ছিলেন কোচও। আজাদ স্পোর্টিং ফুটবল দলের কোচিং করেছেন কয়েক বছর। ষাটের দশকে তিনি হকি দলেও নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর খেলোয়াড়ি জীবন প্রমাণ করে যে তিনি সত্যিই এক ‘মাল্টি-ট্যালেন্টেড’ ক্রীড়াবিদ।

ব্যক্তিগত তথ্যবিবরণ
জন্ম২৯ অক্টোবর ১৯৩২, সিলেট
বয়সে মৃত্যুর সময়৯৩ বছর
মূল ক্লাবইস্পাহানি ক্লাব, আজাদ স্পোর্টিং, মোহামেডান (কলকাতা)
জাতীয় প্রতিনিধিত্বপূর্ব পাকিস্তান ফুটবল দল, পূর্ব পাকিস্তান হকি দল
উল্লেখযোগ্য অর্জনআজাদ স্পোর্টিং লিগ শিরোপা (১৯৫৮), প্রথম আলো ক্রীড়া পুরস্কার (২০০৬), জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার (২০০৭)
শেষ জীবনস্ত্রী রেখা দাসের সঙ্গে সিলেটের ‘কমলাকান্ত ভবন’-এ নিঃশব্দ জীবন

রণজিৎ দাসের জীবন যেন এক জীবন্ত ইতিহাস। উচ্চতার কারণে পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলে সুযোগ না পাওয়া তার এক মাত্র আক্ষেপ। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, “উচ্চতা কম ছিল বলেই হয়তো হলো না।” তবে সেই ক্ষত পূরণ হয়েছিল ২০০৬ সালে প্রথম আলো ক্রীড়া পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা এবং পরের বছর জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পেয়ে।

শেষ জীবনে তিনি ছিলেন নিঃশব্দ, প্রিয় স্ত্রী রেখা দাসের সান্নিধ্যে। যে মানুষটি একসময় ‘টেলিগ্রাম যুগের মানুষ’ বলে নিজেকে পরিচয় দিতেন, আজ সেই মানুষটি নির্বাক হয়ে অনন্তলোকে মিলিয়ে গেলেন।

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে একের পর এক নক্ষত্র হারাচ্ছে—২০১২ সালে জহিরুল হক, ২০২৪ সালে জাকারিয়া পিন্টু, আর আজ রণজিৎ দাস। সিলেটের সেই পাহাড়ি রাস্তা এখন আর ফুটবল-হকির গল্প শোনার জন্য ভিড় জমাবে না। তবে রণজিৎ দাসের রেখে যাওয়া বীরত্বগাথা বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের ইতিহাসের পাতায় সোনালী অক্ষরে অম্লান থাকবে।