চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীকে স্মরণ

বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনে যাঁর নাম শ্রদ্ধা ও গৌরবের সঙ্গে উচ্চারিত হয়, সেই খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী ছিলেন আধুনিক দৃশ্যমান শিল্পের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। বাংলাদেশের চিত্রকলার ইতিহাসে তিনি যে নতুন রঙ, ভাষা ও বিন্যাস যোগ করেছিলেন, তা আজ আমাদের শিল্পঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ।

কাইয়ুম চৌধুরী ১৯৩২ সালের ৯ মার্চ ফেনী জেলার এক অবক্ষয়ী জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। যদিও পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা ততটা সচ্ছল ছিল না, তবুও পরিবারে ছিল শিক্ষা, সংস্কৃতি ও উদারমননের পরিবেশ। এই পরিবেশই পরবর্তীতে তাঁর সৃজনশীলতার ভিত্তি গড়ে দেয়।

তিনি বিভিন্ন মাধ্যম—তেল রঙ, জলরঙ, কালি-কলম, মোমরঙ ও রেশমছাপ—ব্যবহার করে চিত্রকলা সৃজন করেছেন। তাঁর শিল্পভাষার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল জ্যামিতিক আকারের স্পষ্ট ব্যবহার। রঙিন পটভূমির ওপর দৃঢ় ও মোটা রেখার নকশা তাঁর স্বাতন্ত্র্য নির্দেশ করে, যা দূর থেকেও সহজে চেনা যেত।

রঙের উজ্জ্বলতা ছিল তাঁর কাজের অন্যতম পরিচায়ক। লাল, নীল ও সবুজ—এই তিন রঙের প্রাণময় ব্যবহার তাঁর ক্যানভাসকে আলোকিত করত। এই রঙিন বর্ণভঙ্গি তাঁকে প্রায়ই আঁরি-মাতিসের শিল্পভাবনার সঙ্গে তুলনা করা হলেও, তাঁর শিল্প ছিল সম্পূর্ণ নিজস্ব এবং বাংলাদেশের জীবনযাপনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত।

লোকশিল্পও তাঁর শিল্পচেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গ্রামীণ জীবনের পরিচিত উপাদান যেমন পুতুল, পাখা, হাঁড়ি, শীতলপাটি ও কাঁথার নকশা—এইসব বারবার ফিরে এসেছে তাঁর চিত্রকর্মে।

তাঁর চিত্রগুলোতে বর্গাকার বিন্যাসের আধিক্য ছিল, যা সরল জ্যামিতিক ভাবনার প্রতিফলন। এই বৈশিষ্ট্য তাঁকে আধুনিক চিত্রকলার নতুন দিশা দেখিয়েছে।

শিল্পে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেয়েছেন—

বছরসম্মাননা
১৯৮৬একুশে পদক
২০১০সুফিয়া কামাল পদক

কাইয়ুম চৌধুরী ২০১৪ সালের ৩০ নভেম্বর পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। তাঁর রঙ, রেখা ও বিন্যাস বাংলাদেশের শিল্প-ইতিহাসে চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

তার কাজ শুধু চিত্রকলার দিক থেকে নয়, বরং বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন, সংস্কৃতি ও লোকশিল্পের সংমিশ্রণে নতুন শিল্পভাষা গঠনের দিক থেকেও অনন্য। কাইয়ুম চৌধুরী ছিলেন সেই শিল্পী, যিনি আধুনিকতার সঙ্গে আমাদের ঐতিহ্যকে সুন্দরভাবে সংমিশ্রিত করেছেন, এবং তাঁর এই অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।