চরমপন্থীদের হামলার বিরুদ্ধে সংগীতের শক্তি

ঢাকা: সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বাংলাদেশে দুইটি প্রধান সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান—ছায়ানট ও উদীচী—কে লক্ষ্য করে ভয়াবহ হামলা সংঘটিত হয়েছে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইসলামি ও বাঙালি পরিচয়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন আবারও প্রকাশিত হয়েছে। হামলার পিছনে радিকাল ইসলামি গোষ্ঠীর সম্ভাবনা উড়িয়ে বলা যায় না। এই হামলার ফলে কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়নি, সাংস্কৃতিক ও জাতীয় পরিচয়কেও আঘাত পৌঁছেছে।

ছায়ানট ও উদীচী দুই প্রতিষ্ঠানই দেশের স্বাধীনতার আগে প্রতিষ্ঠিত এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বাংলা সংস্কৃতি ও সংগীতের প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু ডিসেম্বর ১৮ ও ১৯ তারিখে ঢাকা শহরে তাদের অফিসে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে, যেখানে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কazu নজরুল ইসলামের ছবি নষ্ট করা হয়।

সাম্প্রতিক হামলার প্রেক্ষাপট

প্রতিষ্ঠানপ্রতিষ্ঠার বছরসদস্যসংখ্যা / শিক্ষার্থীপূর্বে আক্রান্ত ঘটনামৃত্যুর সংখ্যাহামলাকারী গোষ্ঠী
ছায়ানট১৯৬১>৪,০০০ ছাত্র২০০১ সালের বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান১০হারকাত-উল-জিহাদ আল-ইসলামি
উদীচী১৯৬৮~১৫,০০০ সদস্য১৯৯৯ সালের যশোর অনুষ্ঠান, ২০০৫ নেত্রকোণা১৮জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ

হামলার আগে বাংলাদেশের জামায়াতে-ইসলামী ছাত্র শাখার নেতা মোস্তাফিজুর রহমান এই দুই সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে “চূর্ণ করার” আহ্বান জানিয়েছিলেন। যদিও পরে তিনি বলেছিলেন এটি “শারীরিক ধ্বংস নয়”, হামলার পর থেকেই এই বক্তব্য বিতর্কিত হয়ে উঠেছে।

উদীচীর সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে বলেন, “এই হামলা দীর্ঘদিন ধরে আমাদের বাংলা পরিচয়কে নষ্ট করার চেষ্টা করছে। তারা চান, দেশের সংস্কৃতি ও ভাষা বাদ দিয়ে একটি কঠোর ইসলামিক পরিচয় গড়ে উঠুক।” ছায়ানটের সভাপতি ড. সারওয়ার আলি আরও যোগ করেন, “বাংলা গান ও সংস্কৃতিকে ইসলামর সাথে বিরোধী মনে করা তাদের লক্ষ্য।”

হামলার সঙ্গে দেশটির প্রধান সংবাদমাধ্যমগুলোকেও লক্ষ্য করা হয়েছে, পাশাপাশি হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে এই ধরনের হামলা কিছু রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠীকে তাদের ভোটসংখ্যা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।

সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিক্রিয়া

হামলার পর উদীচী ও ছায়ানট নেতারা হাল ছাড়েননি। ডিসেম্বর ২০ তারিখে উদীচীর কর্মীরা ও সমর্থকরা অফিসের বাইরে গান গাইয়ে প্রতিরোধ দেখান এবং দেশের বিভিন্ন শহরে প্রতিবাদ সভা চালাচ্ছেন। উদীচী সভাপতি দে বলেন, “আমাদের আর কোন পথ অবশিষ্ট নেই। আমরা সামনের দিকে এগোতেই হবে।”

অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ যদিও বড়—ছায়ানটের ক্ষতি প্রায় ২৪ মিলিয়ন টাকা—কিন্তু সাংস্কৃতিক ও মানসিক ক্ষতি পরিমাপের বাইরে। অনেক শিল্পী এখন আতঙ্কিত, বাড়িতে সরে যাওয়ায় দেশের সাংস্কৃতিক পরিধি সংকুচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সমাজ এই হামলার মাধ্যমে পুনরায় তার অবস্থান প্রমাণ করেছে: চ্যালেঞ্জ থাকলেও বাংলা সংগীত ও সংস্কৃতি রক্ষায় তারা স্থির সংকল্পবদ্ধ।