বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পরিবহন অবকাঠামো আধুনিকায়নের পথে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জিত হলো। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) চট্টগ্রাম–দোহাজারী রেলপথের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে ৬৮ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলারের একটি বড় ঋণ অনুমোদন করেছে। এই অর্থায়নের মাধ্যমে দেশের অন্যতম কৌশলগত রেল করিডোরকে আধুনিক, সক্ষম ও পরিবেশবান্ধব করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
২২ ডিসেম্বর ঢাকায় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ঋণচুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে স্বাক্ষর করেন ইআরডি সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী এবং এডিবির পক্ষে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর হো ইউন জিয়ং। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা একে দেশের রেল নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এই অর্থায়ন ‘দক্ষিণ এশিয়া উপআঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা (সাসেক) চট্টগ্রাম–দোহাজারী রেল প্রকল্প’-এর আওতায় দেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য বিদ্যমান প্রায় ৩৫ কিলোমিটার রেললাইন পুনর্বাসন ও উন্নয়ন এবং নতুন করে ২ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বাইপাস রেলপথ নির্মাণ। এই বাইপাস চালু হলে ঢাকা ও কক্সবাজারগামী ট্রেনগুলো চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে প্রবেশ না করেই চলাচল করতে পারবে, ফলে স্টেশন এলাকার চাপ কমবে এবং যাত্রাসময় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
ঢাকা–চট্টগ্রাম–কক্সবাজার করিডোরটি দেশের মোট যাত্রী পরিবহনের প্রায় ৩২ শতাংশ এবং পণ্য পরিবহনের প্রায় ৫৫ শতাংশ বহন করে। ফলে এই রেলপথের সক্ষমতা বৃদ্ধি হলে জাতীয় অর্থনীতিতে সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত রেল যোগাযোগ পরিবহন ব্যয় কমাবে, সরবরাহ শৃঙ্খলা আরও নির্ভরযোগ্য করবে এবং শিল্প ও বাণিজ্যের গতি বাড়াবে।
পর্যটননির্ভর কক্সবাজার অঞ্চলের জন্যও এই প্রকল্প বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বর্তমানে অঞ্চলটি মূলত সড়ক পরিবহনের ওপর নির্ভরশীল। আধুনিক রেল যোগাযোগ গড়ে উঠলে পর্যটন, মৎস্য ও রপ্তানিমুখী শিল্পে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি সড়কে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাবে।
এডিবি জানিয়েছে, প্রকল্পটি রেলসেবার নির্ভরযোগ্যতা ও দুর্যোগ সহনশীলতা বাড়াবে এবং পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করবে। ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে এই করিডোর আঞ্চলিক সংযোগ জোরদার করবে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করবে।
প্রকল্পের প্রধান উপাদানগুলো নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো—
| উপাদান | বিবরণ |
|---|---|
| রেললাইন উন্নয়ন | ৩৫ কিমি রেলপথ আধুনিকীকরণ ও উন্নয়ন |
| নতুন নির্মাণ | ২.৫ কিমি বাইপাস রেলপথ |
| অবকাঠামো | ডুয়েল গেজ ট্র্যাক স্থাপন |
| প্রযুক্তি | আধুনিক সিগন্যালিং ও উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা |
| রোলিং স্টক | ৩০টি জ্বালানি সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব লোকোমোটিভ |
| স্টেশন উন্নয়ন | তিনটি স্টেশনের আধুনিকায়ন |
| মানবসম্পদ | বাংলাদেশ রেলওয়ের জনবল প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধি |
১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। বাংলাদেশে পরিবহন খাতে এডিবির এই নতুন অর্থায়ন রেল আধুনিকায়নের পথে সরকারের প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
