চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে গত কয়েক দিনের অস্থিরতার মধ্যে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। নগরীর নিউ মার্কেট মোড় সংলগ্ন ঐতিহাসিক দোস্ত বিল্ডিংয়ে অবস্থিত চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়টি পুনরায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন দলটির নেতাকর্মীরা। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে একদল নেতাকর্মী ভবনটিতে গিয়ে ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’র (এনসিপি) সাইনবোর্ড সরিয়ে ফেলে পুনরায় উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাইনবোর্ড ও স্টিকার লাগিয়ে দেন।
ঘটনার বিবরণ ও নেতাকর্মীদের প্রতিক্রিয়া
সোমবার বিকেলে উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক শওকত উল আনাম এবং সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা কাজী সুরুজের নেতৃত্বে একদল নেতাকর্মী দোস্ত বিল্ডিংয়ের চতুর্থ তলায় অবস্থিত কার্যালয়টিতে উপস্থিত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, নেতাকর্মীরা কার্যালয়ের প্রধান ফটকের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। এ সময় তারা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে পুনরায় দলীয় আধিপত্য ঘোষণা করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, দুজন ব্যক্তি অত্যন্ত দ্রুততার সাথে কার্যালয়ের দরজার ওপর ‘উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ’ লেখা নতুন স্টিকার সেঁটে দিচ্ছেন।
নেতাকর্মীরা দাবি করেছেন যে, ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর তাদের এই কার্যালয়টি দখল করে নিয়েছিল এনসিপি বা জাতীয় নাগরিক পার্টি। শওকত উল আনাম অভিযোগ করে বলেন, “আমরা ভেতরে ঢুকে দেখতে পাই আমাদের দীর্ঘদিনের ব্যবহৃত আসবাবপত্র, আলমারি, আইপিএস এবং গুরুত্বপূর্ণ ফাইলপত্র লুট করা হয়েছে। এমনকি আমাদের জাতীয় ও স্থানীয় প্রয়াত নেতাদের ছবিগুলো পর্যন্ত সেখানে নেই।” বর্তমানে নেতাকর্মীরা কার্যালয়টি পরিষ্কার করে নিজেদের নতুন তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন।
বিগত মাসগুলোর অস্থিরতার কালপঞ্জি
গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের এই কার্যালয়টি বেশ কয়েকবার হামলার শিকার হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটটি বুঝতে নিচের সারণিটি লক্ষ্য করা যেতে পারে:
| তারিখ ও সময় | ঘটনার বিবরণ | ফলাফল/প্রভাব |
| ৫ আগস্ট, ২০২৪ | আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন। | কার্যালয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। |
| ২১ অক্টোবর, ২০২৪ | একদল যুবক কার্যালয়টি দখল করে তালা ঝুলিয়ে দেয়। | শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ভাঙচুর ও এনসিপির সাইনবোর্ড স্থাপন। |
| ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ | লালদীঘি পাড়ে ছাত্রলীগের তৎপরতা। | শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল পরিষ্কার করেন নেতাকর্মীরা। |
| ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ | আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের কার্যালয়ে প্রবেশ। | তালা ভেঙে দখলমুক্ত করা এবং পুনরায় সাইনবোর্ড স্থাপন। |
আইনি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের ২১ অক্টোবরের ঘটনার ভিডিওতে দেখা গিয়েছিল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) চট্টগ্রাম মহানগরের যুগ্ম সমন্বয়কারী আরিফ মঈনুদ্দিনকে। অভিযোগ রয়েছে যে, তখন থেকেই কার্যালয়টি এনসিপির নিয়ন্ত্রণে ছিল। সোমবারের এই পুনরুদ্ধার অভিযানের সময় এনসিপির কোনো নেতাকে সেখানে পাওয়া যায়নি। তবে এ নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকার পতনের প্রায় দেড় বছর পর দলীয় কার্যালয় পুনরুদ্ধার এবং ম্যুরাল পরিষ্কার করার মতো কার্যক্রমগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা পুনরায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে কার্যালয়টি এভাবে তালা ভেঙে দখলে নেওয়ার ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলার অবনতি হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানা গেছে।
দখল ও পাল্টা দখলের এই সংস্কৃতি চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসকে আরও জটিল করে তুলছে। উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেননি, তবে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের এই কার্যক্রম রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
