বরিশালের গৌরনদী উপজেলায় মাদক, সন্ত্রাস ও অসাধু তৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বার্তা দিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এমপি। সোমবার, ১৬ মার্চ, উপজেলার আইনশৃঙ্খলা কমিটির বিশেষ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন, মাদকের সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তি—সে নেতা, কর্মী বা প্রভাবশালী মহলের কেউই হোক না কেন—আইনের বাইরে থাকার সুযোগ পাবে না। তাঁর ভাষ্যে, তরুণ ও যুবসমাজকে মাদকের ভয়াবহ থাবা থেকে রক্ষা করতে হলে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত ও অবিচল ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, সভায় তিনি “জিরো টলারেন্স” নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন এবং মাদকবিরোধী অবস্থানকে প্রশাসনিক অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেন।
মন্ত্রীর বক্তব্যে শুধু আইন প্রয়োগের কঠোরতা নয়, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাও উঠে আসে। তিনি বলেন, মাদক একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি পারিবারিক অস্থিরতা, শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হওয়া, কিশোর অপরাধ, চাঁদাবাজি, সহিংসতা এবং সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ানোর মতো আরও নানা সমস্যার সঙ্গে যুক্ত। সে কারণে মাদকবিরোধী অভিযানকে শুধু অভিযানে সীমাবদ্ধ না রেখে গোটা সমাজকে সম্পৃক্ত করতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অভিভাবক সমাজ, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও স্থানীয় প্রশাসনের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া স্থায়ী ফল পাওয়া কঠিন।
সোমবার দুপুরে অনুষ্ঠিত ওই সভায় ঈদযাত্রাকে সামনে রেখে সড়ক নিরাপত্তা ও যাত্রীসেবার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। মন্ত্রী গৌরনদী মডেল থানা ও হাইওয়ে থানার দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বিশেষ নির্দেশনা দেন, যাতে ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন থাকে, যানজট নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং যাত্রাপথে কোনো ধরনের হয়রানি না ঘটে। সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ সদর দপ্তরও ঈদে যাত্রীদের নিরাপদ ভ্রমণের জন্য আগেভাগে যাত্রা পরিকল্পনা, অতিরিক্ত গতি এড়িয়ে চলা এবং ঝুঁকিপূর্ণভাবে ছাদে বা পণ্যবাহী যানবাহনে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে। ফলে গৌরনদীর এই সভার নির্দেশনা জাতীয় নিরাপত্তা-বার্তার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
সভায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ইব্রাহীম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক খায়রুল আলম সুমন এবং পুলিশ সুপার এ.জেড.এম মোস্তাফিজুর রহমান। এছাড়া গৌরনদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু ছালেহ মো. আনসার উদ্দিন, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা পলাশ সরকার, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফখরুল ইসলাম মৃধা, মডেল থানার ওসি (তদন্ত) মো. মাহবুবুর রহমান, হাইওয়ে থানার ওসি মো. শামীম শেখ, স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব এবং সাংবাদিকরা সভায় অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতি থেকে বোঝা যায়, বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক নয়; বরং স্থানীয় সমাজ-রাজনীতির বিভিন্ন অংশও এ উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
বাংলাদেশে মাদক পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগের বিষয়। বিভিন্ন সময় সরকারি ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ নানা ধরনের মাদক দেশের শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। অতীতে প্রকাশিত পরিসংখ্যান ও সাম্প্রতিক সংবাদপ্রবাহ ইঙ্গিত দেয়, মাদক ব্যবসা কেবল সীমান্তঘেঁষা এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং এর জাল প্রশাসনিক দুর্বলতা, অপরাধচক্রের সক্রিয়তা এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের আশ্রয়ে আরও জটিল হয়েছে। এমনকি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ভেতরেও অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে, যা সমস্যাটির গভীরতা বোঝায়। এই বাস্তবতায় গৌরনদীতে মন্ত্রীর বক্তব্য কেবল রাজনৈতিক ঘোষণা নয়, বরং প্রশাসনিক সতর্কবার্তাও বটে।
নিচে সভায় আলোচিত প্রধান বিষয়গুলোর একটি সংক্ষিপ্ত সারণি দেওয়া হলো—
| বিষয় | সিদ্ধান্ত/বার্তা | দায়িত্বপ্রাপ্ত পক্ষ |
|---|---|---|
| মাদকবিরোধী নীতি | জিরো টলারেন্স, কাউকে ছাড় নয় | স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, সংশ্লিষ্ট দপ্তর |
| রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী ব্যক্তির সম্পৃক্ততা | পরিচয় বিবেচনা নয়, আইনানুগ ব্যবস্থা | আইনশৃঙ্খলা বাহিনী |
| ঈদযাত্রা নিরাপত্তা | যাত্রীসেবা, যানজট নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ চলাচল | গৌরনদী মডেল থানা, হাইওয়ে থানা |
| স্থানীয় সমন্বয় | প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সমাজপক্ষের সমন্বিত ভূমিকা | উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটি |
| যুবসমাজ সুরক্ষা | মাদক প্রতিরোধকে সামাজিক অগ্রাধিকার | পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন |
স্থানীয় পর্যায়ে এই ধরনের বার্তা বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ জিরো টলারেন্স ঘোষণা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি জরুরি তা মাঠপর্যায়ে নিরপেক্ষভাবে কার্যকর করা। গৌরনদীর সভা সেই অর্থে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক ও সমাজসচেতন মহল মনে করছেন, প্রশাসন যদি ধারাবাহিক অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি, জনসচেতনতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা একসঙ্গে বজায় রাখতে পারে, তবে মাদক নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। তরুণ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখা এবং ঈদযাত্রাকে নিরাপদ করার দুইটি লক্ষ্য একসঙ্গে সামনে রেখে গৌরনদীতে যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা বৃহত্তর অর্থে জননিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
