গোলপোস্ট জ্বালানো সেই মেয়ে, আজ গোলের কারখানা

নেপালের পোখারায় সম্প্রতি শেষ হওয়া সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে ফাইনালের ব্যর্থতার আক্ষেপ কাটিয়ে উঠে নতুন প্রজন্মের তারকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন আলপি আক্তার। বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুমে শিরোপা হাতছাড়া হওয়ার হতাশা তখন সর্বত্র বিরাজ করছিল, তবে সেই মেঘলা পরিবেশেও আলপির আলোকোজ্জ্বল পারফরম্যান্স সবাইকে মোহিত করেছিল। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা (৭ গোল) এবং ‘টুর্নামেন্ট সেরা খেলোয়াড়’ পুরস্কার দু’টিই পঞ্চগড়ের এই কিশোরীর ঝুলিতে উঠেছে।

পেছনের গল্প: সাধারণ সংসার, অসাধারণ স্বপ্ন

আলপি আক্তারের ফুটবল যাত্রা মোটেও সরল ছিল না। পঞ্চগড় জেলার বোদা পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আলপির বাবা আতাউর রহমান ছোট একটি দোকানে চা-বিস্কুট বিক্রি করেন। সীমিত আয়ে সংসার চালানোই যখন দায়, তখন মেয়ের ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখাটা অনেকের কাছে ছিল বিলাসিতা। শুরুতে সামাজিক বাঁধাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। মেয়েমানুষ হয়ে ফুটবল খেলা ও ছোট চুল কাটার কারণে নানা সমালোচনা শুনতে হতো।

তবে এই প্রতিকূলতায় একমাত্র বড় ভাই নূর আলম ছিলেন আলপির পাথেয়। তিনি ফোনে প্রথম আলোকে বলেছিলেন,

“চুল কাটলে মানুষ নানা কথা বলত। মা-বাবাও ভয় পেতেন। আমি সবসময় আলপিকে সমর্থন দিতাম।”

ফুটবল যাত্রা: গোলকিপার থেকে স্ট্রাইকার

আলপির খেলা শুরু হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ টুর্নামেন্টে। তখন তিনি গোলপোস্টের তলায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাফুফের নিবন্ধিত কোচ মোফাজ্জল হোসেন বিপুল তাঁর সম্ভাবনা দেখেন এবং গোলকিপার থেকে স্ট্রাইকারে পরিবর্তন করেন। নূর আলম জানান,

“প্রধান শিক্ষক নিজে মোটরসাইকেলে করে আলপিকে মাঠে নিয়ে যেতেন। কোচ বিপুল ভাই বলেছিলেন, ‘ওকে আমার একাডেমিতে দেন, ও অনেক দূর যাবে।’”

দুই বছর গোলকিপার হিসেবে খেলার পর, আলপি রংপুর বিভাগের সেরা স্ট্রাইকার হয়ে জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৬ ক্যাম্পে জায়গা করে নেন। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সূচনা এখান থেকে। ঢাকায় এবারের নারী লিগে রাজশাহী স্টারসের হয়ে ৮ ম্যাচে ২৫ গোল করেছেন, যা লিগের সর্বোচ্চ।

বহুমুখী প্রতিভা ও শিক্ষা

ফুটবল ছাড়াও আলপি দৌড়, হাইজাম্প, লংজাম্প ও সাঁতারে পারদর্শী। তাঁর ঝুলিতে আছে ১৮টি বিভিন্ন প্রতিযোগিতার সার্টিফিকেট। এবার তিনি বোদা পাইলট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেবেন।

সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন না হওয়ায় আক্ষেপ এখনও কাটেনি। পোখারা থেকে ভাইকে ফোনে জানিয়েছেন,

“ফাইনাল ভালো হয়নি বলে মন খারাপ।”

নূর আলম বলেন,

“আমরা তার সাফল্যে গর্বিত। আলপি প্রমাণ করেছে, প্রতিভা ও জেদ থাকলে সব বাধা অতিক্রম করা সম্ভব।”

আলপির সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ রেকর্ড

বিভাগম্যাচগোলপুরস্কার
সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ নারীসর্বোচ্চ গোলদাতা, টুর্নামেন্ট সেরা খেলোয়াড়
ঢাকার নারী লিগ২৫সর্বোচ্চ গোলদাতা (রাজশাহী স্টারস)

টানাটানির সংসার, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা এবং কঠোর মাঠের লড়াইকে ‘ড্রিবল’ করে আলপি আক্তার এখন দক্ষিণ এশিয়ার অনূর্ধ্ব-১৯ বিভাগে নিজের স্থান নিশ্চিত করেছেন। দলের সঙ্গে ঢাকা ফেরার পরও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি পাননি তিনি।