গোপন বাণিজ্য চুক্তির প্রভাবে দেশীয় কৃষিখাতে বিপর্যয়ের আশঙ্কা বাসদ নেতার

বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ দেশের কৃষি, অর্থনীতি এবং বিগত সরকারের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে অত্যন্ত উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছেন। গত মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি অভিযোগ করেন যে, বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার তাদের মেয়াদের শেষ সময়ে আমেরিকার সাথে একটি গোপন বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করেছে। এই চুক্তির ফলে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশকে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকার মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানিতে বাধ্য করা হয়েছে, যা দেশের কৃষি ব্যবস্থা ও প্রান্তিক কৃষকদের অস্তিত্ব সংকটে ফেলবে।


গোপন চুক্তি ও কৃষিখাতের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব

বজলুর রশিদ ফিরোজের মতে, এই বিশাল অংকের মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানির বাধ্যবাধকতা দেশীয় উৎপাদনের চাহিদাকে সংকুচিত করবে। এর ফলে স্থানীয় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হবেন এবং কৃষি অর্থনীতিতে বিজাতীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবে। তিনি এই চুক্তিকে ‘জাতীয় স্বার্থবিরোধী’ হিসেবে অভিহিত করেন।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিষদ আয়োজিত ‘নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা: প্রথম ১০০ দিনের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক এই সভায় তিনি আন্তর্জাতিক চুক্তির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানান। তিনি বিগত ৫৫ বছরে ভারত, আমেরিকা ও জাপানের সাথে হওয়া সব চুক্তির বিস্তারিত জনগণের সামনে প্রকাশের আহ্বান জানান।


রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিযোগের সারসংক্ষেপ

সভায় উত্থাপিত প্রধান প্রধান দাবি ও অভিযোগগুলো নিচে টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:

বিষয়অভিযোগ ও দাবির বিবরণ
মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি৫ বছরে ৪২ হাজার কোটি টাকার মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানির গোপন চুক্তি।
অন্তর্বর্তী সরকার১৮ মাসের কার্যক্রম নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি ও উপদেষ্টাদের দুর্নীতির তদন্ত।
নির্বাচনী ব্যবস্থাসদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে ২৩৬ জন কোটিপতির জয়কে ‘কোটিপতিদের ক্লাব’ হিসেবে আখ্যা।
আদানি চুক্তিআদানির সাথে হওয়া স্বার্থবিরোধী বিদ্যুৎ চুক্তি বাতিলের কার্যকর পদক্ষেপের অভাব।
পররাষ্ট্রনীতিপ্রতিবেশী দেশ ভারতের সাথে সমমর্যাদা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ার আহ্বান।
শহীদ ও আহতদের পুনর্বাসনজুলাই অভ্যুত্থানের আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে অবহেলার অভিযোগ।

গণতন্ত্র ও নির্বাচন নিয়ে কঠোর সমালোচনা

নির্বাচন মানেই গণতন্ত্র নয়—হিটলার ও মুসোলিনির উদাহরণ টেনে বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, নির্বাচিত সরকার কতটুকু গণতান্ত্রিক তা নির্ভর করে জনগণের ক্ষমতায়নের ওপর। তিনি সদ্য সমাপ্ত সংসদ নির্বাচনের সমালোচনা করে বলেন, ৩০০ আসনের মধ্যে ২৩৬ জনই যেখানে কোটিপতি, সেখানে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব। তিনি অভিযোগ করেন যে, নির্বাচন সংস্কার কমিশনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবই গ্রহণ করা হয়নি।

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ছাত্র উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি এবং আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে ১৪ হাজার কোটি টাকার যে দুর্নীতির গুঞ্জন উঠেছে, নতুন সরকারের উচিত তা দ্রুত তদন্ত করা। এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরদের মধ্যে ‘রাজসাক্ষী কেনাবেচার সিন্ডিকেট’ রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখার দাবি জানান তিনি।


আগামীর চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা

বজলুর রশিদ ফিরোজ উল্লেখ করেন যে, ২০২৬ সালে গঙ্গার পানি চুক্তির নবায়ন এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন বর্তমান সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হবে। তিনি দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে এবং ২ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ‘পুকুরভিত্তিক কর্মসংস্থান’ প্রকল্পের প্রস্তাব করেন।

মতবিনিময় সভায় বক্তারা একমত হন যে, নতুন সরকারকে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতির তদন্ত এবং জুলাই অভ্যুত্থানে আহতদের যথাযথ পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। সভায় সভাপতিত্ব করেন শেখ আবদুন নূর এবং আলোচনায় অংশ নেন সাইফুল হক, অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী ও সোহরাব হাসানসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।