গোপন আঁতাত বনাম ইসলামের ইনসাফ: চরমোনাই পীরের হুশিয়ারি

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও আন্তর্জাতিক মেরুকরণ নিয়ে এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসনে হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মুফতি আব্দুল মালেক আনোয়ারীর সমর্থনে আয়োজিত এক বিশাল নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি বলেন, “দাঁড়িপাল্লার এক পাল্লায় এখন গোপনে আমেরিকা, আর অন্য পাল্লায় ভারত অবস্থান করছে।” প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর তথাকথিত ‘ইনসাফ’ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি এই মন্তব্য করেন।

ভূ-রাজনীতি ও ইনসাফ প্রসঙ্গ

বাউফলের জনসভায় রেজাউল করীম বলেন, যারা দাঁড়িপাল্লাকে ইনসাফ বা ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে দাবি করেন, তাদের প্রকৃত চেহারা এখন উন্মোচিত। তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি শক্তির প্রভাব সাধারণ মানুষের সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ণ করছে। তাঁর মতে, বাংলাদেশের মানুষ এখন আর কোনো বিদেশি শক্তির প্রেসক্রিপশনে চলা ইনসাফ দেখতে চায় না; তারা চায় ইসলামের শাশ্বত ও প্রকৃত ন্যায়বিচার। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ আমেরিকার ইনসাফ দেখতে চায় না, আমরা ভারতের ইনসাফ দেখতে চাই না। আমরা কেবল ইসলামের ইনসাফ দেখতে চাই।”

৫৪ বছরের ব্যর্থতা ও রাষ্ট্র সংস্কার

পটুয়াখালী শহরের শহীদ আলাউদ্দিন শিশু পার্কে অনুষ্ঠিত অপর এক সভায় চরমোনাই পীর দেশের দীর্ঘ ৫৪ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসের ব্যবচ্ছেদ করেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে গত ৫৪ বছর ধরে প্রচলিত আইনেই দেশ শাসিত হয়েছে, কিন্তু সাধারণ মেহনতি মানুষের ভাগ্যের কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। তিনি উল্লেখ করেন যে, ছাত্র-জনতার সাম্প্রতিক অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে মানুষ একটি জুলুম ও নির্যাতনমুক্ত ‘সোনার বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু বর্তমানে ক্ষমতালোভী ও স্বার্থান্বেষী মহলের নানামুখী নীল-নকশার কারণে সেই আকাঙ্ক্ষা ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।


ইসলামী আন্দোলনের রাজনৈতিক দর্শন ও প্রতিশ্রুতির সারসংক্ষেপ

বিষয়চরমোনাই পীরের বক্তব্য ও প্রতিশ্রুতি
রাজনৈতিক আমূল পরিবর্তনপ্রচলিত মানবরচিত আইন নয়, পবিত্র কুরআনের আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনা।
প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধক্ষমতা পরিবর্তনের পর পালানোর সংস্কৃতি ও নিরপরাধের হয়রানি বন্ধ করা।
সার্বভৌমত্ব রক্ষাআমেরিকা বা ভারতের গোপন হস্তক্ষেপমুক্ত স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি।
নির্বাচনি লক্ষ্যহাতপাখায় ভোট প্রদানের মাধ্যমে ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি করা।
অন্তর্ভুক্তিক্ষমতায় এলে কোনো নিরপরাধ মানুষকে দেশান্তরী হতে হবে না।

প্রতিহিংসার রাজনীতি ও নিরাপদ বাংলাদেশ

ইসলামী আন্দোলনের আমির তাঁর বক্তব্যে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি অন্ধকার দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমরা দেখেছি এক দল ক্ষমতায় আসলে আরেক দল দেশ ছেড়ে পালায়। এটি কোনো সুস্থ রাজনীতির লক্ষণ হতে পারে না।” তিনি ঘোষণা দেন যে, যদি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ক্ষমতায় আসতে পারে, তবে দেশে আইনের শাসন কায়েম হবে এবং কোনো নিরপরাধ মানুষকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে হবে না।

হাতপাখা প্রতীকে ভোট প্রার্থনা করে তিনি সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বলেন, “হাতপাখা প্রতীকের পক্ষে যদি একটা ভোট পড়ে, তবে প্রকারান্তরে ইসলামের পক্ষে একটি শক্তি বাড়ে।” তিনি নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার লক্ষে কাজ করার আহ্বান জানান।

সভার অন্যান্য নেতৃবৃন্দ

বাউফল উপজেলা কমিটির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য প্রার্থী মুফতি আব্দুল মালেক আনোয়ারীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় আরও বক্তব্য রাখেন ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতা নাসির আহমেদ কাউসার এবং হাবিবুর রহমান মিসবাহ। এছাড়া পটুয়াখালী জেলা শাখার সভাপতি হাওলাদার মো. সেলিম মিয়া, বাউফল উপজেলা সদস্য সচিব আলহাজ আবুল হোসেন হাওলাদারসহ স্থানীয় উলামা মাশায়েখ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সভায় উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা প্রত্যেকেই দেশে একটি দুর্নীতিমুক্ত ও ইনসাফপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণে ইসলামী আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।