রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের চলমান আন্দোলন এক অভূতপূর্ব ও আবেগঘন রূপ নিয়েছে। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আর বেতন বৈষম্যের প্রতিবাদে শিক্ষকরা এখন রাজপথে। গত রবিবার বিকেলে কয়েক হাজার শিক্ষক সাদা কাফনের কাপড় হাতে নিয়ে আমরণ লড়াইয়ের শপথ গ্রহণ করেন। তাঁদের স্পষ্ট বার্তা—দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা শ্রেণিকক্ষে ফিরবেন না।
Table of Contents
শপথ ও আন্দোলনের মূল সুর
রবিবার বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে শহীদ মিনারের পাদদেশে সমবেত শিক্ষকরা সমস্বরে শপথ পাঠ করেন। তাঁদের শপথের মূল বক্তব্য ছিল: “১০ম গ্রেড এবং শতভাগ পদোন্নতি ছাড়া আমরা ঘরে ফিরব না।” শিক্ষক নেতারা জানান, তাঁরা অত্যন্ত সম্মানজনক একটি পেশায় থেকেও মানবেতর জীবন যাপন করছেন। তাঁদের দাবি কেবল আর্থিক নয়, বরং এটি তাঁদের আত্মমর্যাদার লড়াই।
শিক্ষকদের প্রধান ৩টি দাবি
আন্দোলনরত শিক্ষকরা মূলত তিনটি সুনির্দিষ্ট দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছেন:
১. ১০ম গ্রেড প্রদান: সহকারী শিক্ষকদের বর্তমান ১৩তম গ্রেড থেকে উন্নীত করে ১০ম গ্রেড (দ্বিতীয় শ্রেণি) প্রদান করতে হবে।
২. শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি: সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক এবং পরবর্তী উচ্চতর পদগুলোতে শতভাগ পদোন্নতির সুযোগ নিশ্চিত করা।
৩. উচ্চতর গ্রেড: চাকরির ১০ বছর ও ১৬ বছর পূর্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চতর গ্রেড প্রদান।
বেতন বৈষম্যের চিত্র: বর্তমান বনাম দাবি
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বর্তমান বেতন কাঠামো এবং দাবির একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
| বিষয় | বর্তমান অবস্থা (১৩তম গ্রেড) | শিক্ষকদের দাবি (১০ম গ্রেড) |
| মূল বেতন (Basic) | ১১,০০০ টাকা | ১৬,০০০ টাকা |
| মর্যাদা | তৃতীয় শ্রেণি | দ্বিতীয় শ্রেণি (গেজেটেড/নন-গেজেটেড) |
| যোগ্যতা | স্নাতক/স্নাতকোত্তর | স্নাতক/স্নাতকোত্তর (একই যোগ্যতা) |
| জীবনযাত্রার মান | বর্তমান বাজারমূল্যের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ | মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাত্রার সহায়ক |
কেন এই ক্ষোভ? শিক্ষক নেতাদের বক্তব্য
শিক্ষক নেতা আনিসুর রহমান আনিস অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে জানান যে, একই শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে অন্য পেশার মানুষ ১০ম গ্রেড পেলেও শিক্ষকদের ১৩তম গ্রেডে আটকে রাখা হয়েছে। তাঁর বক্তব্যের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো:
বৈষম্য: নার্স বা পুলিশের উপ-পরিদর্শকরা (SI) স্নাতক পাস হয়ে ১০ম গ্রেড পেলে, জাতি গড়ার কারিগররা কেন পেছনে থাকবেন?
আর্থিক সংকট: ১৩তম গ্রেডের বেতন বর্তমান যুগে একজন দিনমজুরের আয়ের চেয়েও কম বলে তাঁরা দাবি করেন।
দুর্নীতির অভিযোগ: কোষাগারে টাকার অভাবের কথা বলে বেতন বাড়ানো না হলেও দেশে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাঁরা।
হামলার প্রতিবাদ: এর আগের দিন শাহবাগে শিক্ষকদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশের বাধা ও হামলার তীব্র নিন্দা জানানো হয়।
পরবর্তী পরিস্থিতি ও প্রভাব
প্রাথমিক শিক্ষকরা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড। তাঁদের এই দীর্ঘমেয়াদী আন্দোলনের ফলে সারা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শিক্ষকরা জানিয়েছেন, তাঁরা শোকের প্রতীক হিসেবে কাফন পরেছেন কারণ তাঁরা মনে করেন, বর্তমান বেতন কাঠামোতে বেঁচে থাকা আর মৃত থাকা সমান।
