রাজধানীর উত্তরায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সদ্য সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সাফিকুর রহমানের বাসায় ১১ বছর বয়সী এক শিশু গৃহকর্মীকে পৈশাচিক নির্যাতনের ঘটনায় মামলাটি এখন বিচারিক প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। এই অমানবিক নির্যাতনের মামলায় সাফিকুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী বীথিসহ মোট চারজনের সাত দিনের রিমান্ড আবেদনের ওপর আগামী মঙ্গলবার শুনানির দিন ধার্য করেছেন আদালত।
Table of Contents
আদালতের কার্যক্রম ও জবানবন্দি
আজ রোববার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও উত্তরা পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রোবেল মিয়া আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইসরাত জাহানের আদালত শুনানির জন্য এই দিন নির্ধারণ করেন। একই দিনে নির্যাতনের শিকার ওই শিশু গৃহকর্মী আদালতে উপস্থিত হয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নিজের ওপর চলা লোমহর্ষক নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে জবানবন্দি প্রদান করে। শিশুটির শরীরজুড়ে থাকা ক্ষতচিহ্ন এবং জবানবন্দি থেকে নির্যাতনের ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে।
নির্যাতনের প্রেক্ষাপট ও মামলার বিবরণ
মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, ভুক্তভোগী শিশুটির বাবা একজন সাধারণ হোটেল কর্মচারী। গত বছরের জুন মাসে ভালো থাকা এবং বিয়ের খরচ বহনের আশ্বাসে সাফিকুর রহমানের উত্তরার বাসায় মেয়েকে কাজে দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু গত ৩১ জানুয়ারি শিশুকে অসুস্থ অবস্থায় ফেরত দেওয়ার পর দেখা যায়, তার সারা শরীরে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা এবং মারধরের অসংখ্য গুরুতর জখম রয়েছে।
মামলা ও আসামিদের সংক্ষিপ্ত প্রোফাইল:
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| প্রধান আসামি | সাফিকুর রহমান (সদ্য সাবেক এমডি, বিমান বাংলাদেশ) |
| অন্যান্য আসামি | স্ত্রী বীথি, গৃহকর্মী রূপালী খাতুন ও সুফিয়া বেগম |
| ভুক্তভোগী | ১১ বছর বয়সী শিশু কন্যা |
| অভিযোগের ধরন | মারধর, গরম খুন্তির ছ্যাঁকা ও পাশবিক নির্যাতন |
| বর্তমান অবস্থা | ৪ আসামি কারাগারে; রিমান্ড শুনানি মঙ্গলবার |
রিমান্ড আবেদনের যৌক্তিকতা
তদন্ত কর্মকর্তা তাঁর রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করেছেন যে, প্রাথমিক অনুসন্ধানে আসামিদের বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশে শিশুকে নির্যাতনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগীর শরীরের ক্ষতচিহ্ন থেকে কেবল শারীরিক নির্যাতন নয়, বরং পাশবিক বা যৌন নির্যাতনেরও আশঙ্কা করা হচ্ছে। নির্যাতনের কাজে ব্যবহৃত গরম খুন্তি উদ্ধার এবং ঘটনার নেপথ্যে থাকা অন্য কোনো আসামির সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা জানার জন্য আসামিদের নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ অত্যন্ত প্রয়োজন।
প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া
এই কলঙ্কজনক ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার সাফিকুর রহমানকে বিমানের এমডির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি প্রদান করে। গত ২ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তার করে।
শিশু অধিকার কর্মীদের মতে, একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বাসায় এমন মধ্যযুগীয় বর্বরতা দেশের শিশু সুরক্ষা আইনের প্রয়োগ নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। বাদী পক্ষ দাবি করছেন, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এবং নানা প্রলোভন দিয়ে শিশুকে আটকে রেখে এই দীর্ঘমেয়াদী নির্যাতন চালানো হয়েছে। তারা আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন যাতে ভবিষ্যতে কেউ অসহায় শিশুদের ওপর এমন জুলুম করার সাহস না পায়।
উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ জানিয়েছে, তারা বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে এবং ফরেনসিক প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে। আগামী মঙ্গলবার রিমান্ড শুনানি শেষে সত্য উদ্ঘাটনে নতুন মোড় আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
