গাজার রাফাহ ক্রসিং আংশিকভাবে খুলে দিচ্ছে ইসরায়েল

দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রবল চাপের মুখে অবশেষে গাজা উপত্যকা ও মিসরের মধ্যকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাফাহ সীমান্ত পারাপার (রাফাহ ক্রসিং) আংশিকভাবে পুনরায় খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল। রবিবার থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই সিদ্ধান্তের ফলে অবরুদ্ধ গাজাবাসীর যাতায়াতে কিছুটা স্বস্তি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এই পারাপারটি বর্তমানে কেবল ‘সীমিত পরিসরে মানুষের চলাচলের’ জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

ক্রসিং খোলার প্রেক্ষাপট ও শর্তাবলী

রাফাহ ক্রসিং পুনরায় চালু করার ক্ষেত্রে ইসরায়েল ইতিপূর্বে বেশ কিছু কঠোর শর্ত আরোপ করেছিল। বিশেষ করে, গাজায় আটক ইসরায়েলি জিম্মি র‍্যান গভিলির মরদেহ ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত এই প্রবেশদ্বার খুলতে তারা অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছিল। চলতি সপ্তাহের শুরুতে গভিলির মরদেহ উদ্ধার এবং বুধবার ইসরায়েলে তার দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর এই প্রতিবন্ধকতা দূর হয়।

শুক্রবার ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেসামরিক বিষয়ক তদারকি সংস্থা ‘কোগ্যাট’ (COGAT) এক বিবৃতিতে জানায়, মিসরের সাথে সমন্বয় করে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মিশনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এই সীমান্ত পারাপারটি উভয় দিকে খোলা হবে। তবে নিরাপত্তার খাতিরে প্রত্যেকটি যাতায়াতের জন্য ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের আগাম নিরাপত্তা ছাড়পত্র থাকা বাধ্যতামূলক।

যুদ্ধবিরতি ও বর্তমান পরিস্থিতি

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশের জন্য হামাস আহ্বান জানানোর পরপরই এই ঘোষণাটি এল। চুক্তির শর্তানুযায়ী, রাফাহ ক্রসিং পরিচালনার দায়িত্ব একটি ফিলিস্তিনি প্রযুক্তিবিদ-নির্ভর (টেকনোক্র্যাট) কমিটির হাতে ন্যাস্ত করার কথা রয়েছে। যদিও ইসরায়েলি বাহিনী তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’-এর পেছনে সরে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তবুও কৌশলগত কারণে ক্রসিংটি এখনো ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে রয়েছে।

রাফাহ ক্রসিং সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলি:

বিষয়ের বিবরণবিস্তারিত তথ্য
অবস্থানগাজা উপত্যকার দক্ষিণ সীমান্ত (মিসর সংলগ্ন)
বন্ধ হওয়ার সময়মে ২০২৪ (ইসরায়েলি বাহিনী দখলের পর)
পুনরায় খোলার তারিখআগামী রবিবার (আংশিক)
পরিচালনা কর্তৃপক্ষইসরায়েল, মিসর ও ইইউ মিশনের সমন্বয়
চলাচলের শর্তসীমিত সংখ্যক মানুষ ও পূর্ব নিরাপত্তা ছাড়পত্র
গুরুত্বত্রাণ প্রবেশের প্রধান পথ ও একমাত্র অ-ইসরায়েলি বহির্গমন পথ

মানবিক গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

গাজার সাধারণ মানুষের জন্য রাফাহ ক্রসিং কেবল একটি সীমান্ত নয়, বরং এটি বহির্বিশ্বের সাথে যুক্ত হওয়ার একমাত্র জীবনরেখা। মে ২০২৪ সালে ইসরায়েলি বাহিনী এর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে ত্রাণ সরবরাহ এবং মুমূর্ষু রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো বারবার সতর্ক করে আসছিল যে, রাফাহ ক্রসিং পুরোপুরি কার্যকর না হলে গাজায় মানবিক বিপর্যয় চরম আকার ধারণ করবে।

যদিও বর্তমানে কেবল মানুষের চলাচলের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশের বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট ঘোষণা আসেনি। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এখনো গাজার অর্ধেকের বেশি এলাকা এবং ফিলাডেলফি করিডোর নিয়ন্ত্রণ করছে, যা ত্রাণ বিতরণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাফাহ ক্রসিং স্থায়ীভাবে এবং পণ্য পরিবহনের জন্য উন্মুক্ত না করা পর্যন্ত গাজার সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ পুরোপুরি লাঘব হবে না।

এই সীমিত পদক্ষেপটি চলমান যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়ায় কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, এখন সেটিই দেখার বিষয়। ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট কমিটির হাতে এই ক্রসিংয়ের দায়িত্ব হস্তান্তর করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদী শান্তির পথে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।