নতুন বছরের সূচনা সাধারণত আশার বার্তা নিয়ে আসে। কিন্তু গাজার মানুষের কাছে ২০২৬ সাল শুরু হয়েছে টিকে থাকার এক নিষ্ঠুর লড়াই দিয়ে। সাদা প্লাস্টিকের ত্রিপল আর কাপড়ের চাদর দিয়ে বানানো অস্থায়ী তাঁবুর ভেতরে সাত সন্তানকে নিয়ে বসবাস করেন ৪১ বছর বয়সী সানা ইসা। ভেজা কম্বল, ঠান্ডা মাটি আর অনিশ্চিত আগামী—এই বাস্তবতার মধ্যেই তাঁর নতুন বছরের যাত্রা।
কাগজে-কলমে গাজায় অস্ত্রবিরতি থাকলেও বাস্তবে তার ছোঁয়া খুব কমই পৌঁছেছে বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবনে। সানা বলেন, “বুঝতে পারি না কাকে দোষ দেব—যুদ্ধ, শীত না ক্ষুধাকে। একটি সংকট শেষ না হতেই আরেকটি সামনে এসে দাঁড়ায়।” তাঁর মতো হাজারো ফিলিস্তিনির কাছে ভবিষ্যতের স্বপ্ন মানে এখন শুধু প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করা, নিরাপদ পানি পাওয়া আর বোমাবর্ষণের মাঝেও সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখা।
২০২৪ সালের নভেম্বরে ইসরায়েলি হামলায় সানার স্বামী নিহত হন। এরপর থেকেই একাই সাত সন্তানের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। পরিবারসহ তাঁকে মধ্য গাজার আল-বুরেইজ ছেড়ে দেইর এল-বালাহ’তে আশ্রয় নিতে হয়। বাস্তুচ্যুতি, খাদ্যসংকট, চিকিৎসার অভাব—সব মিলিয়ে প্রতিটি দিনই তাঁর জন্য কঠিন সিদ্ধান্তের দিন।
২০২৫ সাল ছিল সানার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ সময়। দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতিতে এক কেজি আটা জোগাড় করাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন। তিনি বলেন, “ঘুমাতে যাওয়ার সময় শুধু এটুকুই চাইতাম—পরদিন যেন অন্তত একটু রুটি জোটে। সন্তানদের অনাহারে কাতরাতে দেখে মনে হতো, আমিও ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছি।”
এই ক্ষুধাই তাঁকে বাধ্য করে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত জিএইচএফ ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রগুলোতে যেতে। শুরুতে ভয় থাকলেও জীবনের তাগিদে সেই ভয়কে উপেক্ষা করতে হয়। তবে এসব ত্রাণকেন্দ্র ছিল চরম ঝুঁকিপূর্ণ। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের নভেম্বরের আগে এসব কেন্দ্রের আশপাশে দুই হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হন। অবশেষে একই মাসে এই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
ত্রাণ নিতে গিয়ে সানা নিজেও আহত হন। নেতজারিম কেন্দ্রে শ্রাপনেলের আঘাতে তাঁর হাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাফাহর পূর্বের মোরাগ কেন্দ্রে একই ধরনের আঘাতে তাঁর ১৭ বছর বয়সী মেয়ের বুক জখম হয়। তবু ক্ষুধার তাড়নায় তাঁকে বারবার সেই বিপজ্জনক পথেই ফিরতে হয়েছে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরুর পর থেকে পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়েছে। সানা বলেন, “দুই বছরই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু প্রতিটি বছর আগের চেয়েও কঠিন।” আজ গাজার মানুষের চাওয়া খুব সাধারণ—শীত থেকে বাঁচার মতো একটি তাঁবু, রান্নার জন্য কাঠের বদলে একটি গ্যাস সিলিন্ডার, আর সন্তানদের জন্য নিরাপদ খাদ্য।
গাজায় মানবিক সংকটের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচের টেবিলে তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | বর্তমান অবস্থা |
|---|---|
| বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা | লক্ষাধিক |
| প্রধান খাদ্য সংকট | আটা, রুটি, বিশুদ্ধ পানি |
| ত্রাণকেন্দ্রে নিহত | ২,০০০+ (২০২৪ নভেম্বরের আগে) |
| নিরাপদ আশ্রয়ের অবস্থা | মারাত্মক অপ্রতুল |
| জ্বালানি ও গ্যাস | প্রায় অপ্রাপ্য |
নতুন বছরে গাজার মানুষের স্বপ্ন বড় কিছু নয়। বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম উপকরণই এখন তাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই ভূখণ্ডে প্রতিটি দিন তাই নতুন করে টিকে থাকার পরীক্ষায় পরিণত হচ্ছে।
