বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী পদ তথা গভর্নর হিসেবে একজন সক্রিয় রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীকে নিয়োগ দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ‘নাগরিক কোয়ালিশন’। দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের এই সম্মিলিত প্ল্যাটফর্মটি মনে করে, এই নিয়োগ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিরপেক্ষতা ও স্বায়ত্তশাসনকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলবে। সংগঠনটি অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি সার্চ কমিটির মাধ্যমে পেশাদার ও যোগ্য ব্যক্তি নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে।
Table of Contents
নিয়োগের বিতর্কিত দিকসমূহ
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সরকার দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান হিসেবে এমন একজনকে দায়িত্ব দিয়েছে, যাঁর সামষ্টিক অর্থনীতি বা আর্থিক খাতের উচ্চতর ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কোনো বিশেষায়িত পূর্ব-অভিজ্ঞতা নেই। নাগরিক কোয়ালিশনের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন সরাসরি ব্যবসায়ীকে এই সংবেদনশীল পদে বসানো হয়েছে। এটি কেবল বাংলাদেশের জন্যই নয়, বরং আমাদের অর্থনীতির সমতুল্য অন্য কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্যও একটি নজিরবিহীন ও নেতিবাচক উদাহরণ।
স্বার্থের সংঘাত ও নৈতিকতা প্রশ্ন
বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নবনিযুক্ত গভর্নর দীর্ঘকাল তৈরি পোশাকশিল্প এবং আবাসন খাতের মতো প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সংগঠনের শীর্ষ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন। নাগরিক কোয়ালিশন মনে করে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান হিসেবে এমন ব্যক্তির উপস্থিতি নীতি নির্ধারণে সাধারণ জনগণের স্বার্থের চেয়ে নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী লবির স্বার্থ রক্ষায় বেশি ভূমিকা রাখতে পারে।
নিচে নাগরিক কোয়ালিশনের উত্থাপিত আপত্তির প্রধান ক্ষেত্রগুলো একটি সারণির মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| আপত্তির বিষয় | বিস্তারিত বিবরণ ও প্রেক্ষাপট |
| পেশাগত যোগ্যতা | আর্থিক খাত বা সামষ্টিক অর্থনীতিতে বিশেষায়িত দক্ষতার অভাব। |
| স্বার্থের সংঘাত | পোশাক ও আবাসন খাতের প্রতিনিধি হওয়ায় নীতিগত নিরপেক্ষতা হারানোর শঙ্কা। |
| ব্যক্তিগত ঋণ | নিজ প্রতিষ্ঠানের জন্য ৮০ কোটি টাকার ঋণ বিশেষ বিবেচনায় পুনঃতফসিল করার নজির। |
| রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা | ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সক্রিয় সদস্য হিসেবে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন। |
| নির্বাচনী অঙ্গীকার | ব্যাংক খাতের সুশাসনের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও কর্তৃত্ববাদী লবির প্রভাব বৃদ্ধির ঝুঁকি। |
সুশাসনের অভাব ও জনমনে সংশয়
সংগঠনটি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন উল্লেখ করে জানিয়েছে যে, বর্তমান জাতীয় সংসদের অধিকাংশ সদস্যই ব্যবসায়ী এবং তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধেই ব্যাংক থেকে বিপুল অংকের ঋণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে একজন রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় এবং ব্যবসায়িক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কীভাবে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ আদায় ও সুশাসন নিশ্চিত করবেন, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রবল সংশয় তৈরি হয়েছে।
নাগরিক কোয়ালিশন আরও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, বিএনপি তার নির্বাচনী ইশতেহারে ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওয়াদা করেছিল। কিন্তু এই ধরনের বিতর্কিত নিয়োগ সেই অঙ্গীকারের সরাসরি পরিপন্থী। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবারও প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে এবং বিগত সময়ের মতো ‘কর্তৃত্ববাদী’ ধারার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।
কোয়ালিশনের প্রস্তাবনা
বিবৃতিতে এই সংকট নিরসনে নাগরিক কোয়ালিশন তিনটি প্রধান দাবি উত্থাপন করেছে:
১. বর্তমান গভর্নরের নিয়োগ অবিলম্বে বাতিল বা স্থগিত করা।
২. নিরপেক্ষ ও প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদদের সমন্বয়ে একটি ‘সার্চ কমিটি’ গঠন করে যোগ্য প্রার্থী খুঁজে বের করা।
৩. চূড়ান্ত নিয়োগের আগে সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে প্রার্থীদের প্রকাশ্য শুনানির ব্যবস্থা করা, যাতে তাঁদের যোগ্যতা ও স্বচ্ছতা যাচাই করা সম্ভব হয়।
পরিশেষে, নাগরিক কোয়ালিশন সতর্ক করে দিয়েছে যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হলে তা দেশের সামগ্রিক মুদ্রা বাজার ও আর্থিক স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করে দেবে, যার মূল্য দিতে হবে সাধারণ করদাতাদের।
