গবেষণা ও বিজ্ঞানশিক্ষায় ধীরগতি নিয়ে সতর্কতা

দেশের টেকসই উন্নয়ন, জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠন এবং ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিজ্ঞান ও গবেষণাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক চৌধুরী রফিকুল আবরার (সি আর আবরার)। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক সংকটকাল অতিক্রম করছে, যেখানে বিজ্ঞানশিক্ষায় শিক্ষার্থী ভর্তি কমছে এবং গবেষণার গতিও উদ্বেগজনকভাবে শ্লথ হয়ে পড়ছে। তাঁর ভাষায়, “বিজ্ঞান ও গবেষণায় এই স্থবিরতা কোনো জাতির জন্যই সুখকর হতে পারে না। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়ে অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপর।”

সোমবার বিকেলে সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। কর্মশালার শিরোনাম ছিল—‘জাতীয় ও বৈশ্বিক চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে গবেষণা ও উন্নয়ন শক্তিশালীকরণ: সাশ্রয়ী ও উচ্চ প্রযুক্তিগত সমাধানের ব্যবহার’। এতে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা অংশ নেন।

কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র, বাংলাদেশের ইমেরিটাস সায়েন্টিস্ট অধ্যাপক ফেরদৌসী কাদরী। তাঁর সঙ্গে গবেষণা ও উদ্ভাবন বিষয়ে মতামত তুলে ধরেন বিজ্ঞান–গবেষক আবেদ চৌধুরী এবং বিজ্ঞানী অধ্যাপক মোবারক আহমদ খান। তাঁরা গবেষণার অবকাঠামো, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ঘাটতির বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।

শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার বলেন, গবেষণার ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় বৈষম্য বিদ্যমান। বিশেষ করে যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় সক্রিয়, তারা অনুদান পাওয়ার পর সরকারি ছাড়পত্র ও অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতার কারণে মারাত্মক সমস্যায় পড়ছে। অনেক সময় ছয় থেকে আট মাস পর্যন্ত দেরি হওয়ায় গবেষণার অর্থ সময়মতো ব্যবহার করা যায় না, ফলে সম্ভাবনাময় গবেষণা মাঝপথেই থমকে যায়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জবাবদিহি বজায় রেখেই দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি কার্যকর ‘ফাস্ট ট্র্যাক সিস্টেম’ চালু করা প্রয়োজন।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ বর্তমানে জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ করছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ এমনকি অনেক স্বল্পোন্নত দেশের তুলনায়ও কম। এই বাস্তবতা দেশের ভবিষ্যৎ উদ্ভাবন সক্ষমতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

এলডিসি উত্তরণের প্রেক্ষাপটে ভ্যাকসিন ও স্বাস্থ্য খাতে বাড়তি ব্যয়ের কথাও তুলে ধরেন শিক্ষা উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এই খাতে প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যয় রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে বিজ্ঞান, গবেষণা এবং বিশেষায়িত ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্সে’ বিনিয়োগ ছাড়া বিকল্প নেই।

নিচে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলোঃ

দেশ/অঞ্চলজিডিপির শতকরা হার (গবেষণা ব্যয়)
বাংলাদেশ০.৩%
দক্ষিণ এশিয়ার গড়প্রায় ০.৭%
উন্নয়নশীল দেশগুলোর গড়১%–১.৫%
উন্নত দেশগুলোর গড়২%–৩%

কর্মশালায় বক্তারা একমত হন যে, বিজ্ঞানশিক্ষায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়াতে নীতিগত সংস্কার, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং গবেষণাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জ্ঞানভিত্তিক শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়া কঠিন হয়ে পড়বে।