গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে চেতনানাশক খাইয়ে দলবদ্ধ ধ/র্ষণ: গ্রেপ্তার তিন শিক্ষার্থীর রিমান্ড, তদন্তে নতুন প্রশ্ন

গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে চেতনানাশক খাইয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণ, ভিডিও ধারণ এবং পরবর্তীতে ব্ল্যাকমেল করার অভিযোগে গ্রেপ্তার তিন শিক্ষার্থীর রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। সাভারের আশুলিয়া থানা পুলিশ গ্রেপ্তারের পর আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলাম সোহাগ এই সিদ্ধান্ত দেন। ঘটনাটি শুধু একটি ফৌজদারি মামলা নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নারীর নিরাপত্তা, ছাত্র নেটওয়ার্ক ও যৌন সহিংসতার ক্রমবর্ধমান প্রবণতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

রিমান্ড আবেদন ও আদালতের সিদ্ধান্ত

গতকাল বুধবার চার শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তারের পর আজ তদন্ত কর্মকর্তা—আশুলিয়া থানার পরিদর্শক সফিকুল ইসলাম—তাদের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানিতে আসামিপক্ষ জামিন দাবি করলেও আদালত তাজুল ইসলাম (২৩) ও শ্রাবণ সাহা (২৩)–এর তিন দিনের রিমান্ড এবং অন্তু দেওয়ান (২৮)–এর দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আরেক আসামি দেলোয়ার ভূঁইয়াকে (২৬) কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। রিমান্ডে কী কী তথ্য পাওয়া যেতে পারে, তা নিয়ে পুলিশের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও নজর রাখছে।

ঘটনাপ্রবাহ: পরিকল্পিত ‘ট্র্যাপ’ ও ভয়াবহ নেশাজাতীয় কৌশল

মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে—
৭ এপ্রিল দুপুরে পিকনিকের কথা বলে সহপাঠী দেলোয়ার, তাজুল ও শ্রাবণ তাঁকে আশুলিয়ার ফুলের টেক এলাকায় নিয়ে যায়। যাত্রাপথেই কোমল পানীয়র সঙ্গে চেতনানাশক মিশিয়ে পান করায়। জ্ঞান ফিরে তিনি নিজেকে একটি মেস কক্ষে অচেনা অবস্থায় দেখতে পান এবং বুঝতে পারেন যে তিনি যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। শুধু তাই নয়—ধর্ষণের ছবি ও ভিডিও ধারণ করে তাকে ব্ল্যাকমেল করা হয়। এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তাকে মানসিক চাপ ও নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

দ্বিতীয় দফা হামলা: আরও নৃশংস চেষ্টা

এজাহারে আরও বলা হয়েছে—৬ নভেম্বর সকালে ক্যাম্পাসে যাওয়ার পথে আসামিরা আবারও তাকে আটকে মারধর করে এবং নেশাজাতীয় পানীয় খাওয়ানোর চেষ্টা করে। অভিযোগ অনুযায়ী সিনিয়র অন্তু দেওয়ান তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করতে চান—এই দাবি মানতে বাধ্য করতে সহপাঠীরা তাকে জোরাজুরি করে। কোনোরকমে পালিয়ে ক্যাম্পাসে পৌঁছানোর পর তিনি অচেতন হয়ে পড়েন এবং চিকিৎসার জন্য প্রথমে গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজ, পরে তার অবস্থা খারাপ হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ

এই নৃশংস ঘটনায় গণ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
বলতে গেলে—

  • ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?

  • সহপাঠী দ্বারা সংঘটিত যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে বিশ্ববিদ্যালয়ে কি পর্যাপ্ত নীতিমালা আছে?

  • ছাত্র গোষ্ঠীর প্রভাব বা সিন্ডিকেট কি এসব ঘটনায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীরা দাবি তুলেছেন—নিরাপত্তা ও মনিটরিংয়ে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন।

যৌন সহিংসতা ও ব্ল্যাকমেল—বৈশ্বিক প্রবণতা

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেলের মাধ্যমে যৌন সহিংসতা এখন বৈশ্বিকভাবে বাড়ছে। নেশাজাতীয় দ্রব্য ব্যবহার করে ধর্ষণ ঘটনা (ডেট-রেপ) বিশেষত তরুণ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভয়াবহ আকার নিয়েছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে যে বিষয়গুলো

১. চেতনানাশক কী ছিল?
২. ভিডিও কি আসলেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানোর পরিকল্পনা ছিল?
৩. ঘটনার পেছনে বড় কোনো ছাত্র গ্রুপ বা প্রভাবশালী পক্ষ জড়িত কি না
৪. ভুক্তভোগীকে দীর্ঘ মাস কেন ব্ল্যাকমেল করা হলো

পুলিশ বলছে, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য স্পষ্ট হতে পারে।

শেষ কথা

ঘটনাটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নারী নিরাপত্তার বাস্তবচিত্র আবারও সামনে এনেছে। আইনগত প্রতিকার অবশ্যই প্রয়োজন; তবে তার সঙ্গে প্রয়োজন ক্যাম্পাস সংস্কৃতি, ছাত্রগোষ্ঠীর ক্ষমতাবলয় এবং যৌন–সহিংসতার প্রতি সমাজের ‘খাটো করে দেখার’ দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো।