সদ্য সমাপ্ত গণভোট অধ্যাদেশের কার্যকারিতা শেষ হওয়ায় তা সংসদে বিল আকারে উপস্থাপনের প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ। রোববার (২৯ মার্চ) রাতের জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ তথ্য প্রকাশ করেন।
মন্ত্রী ব্যাখ্যা করেন, “গণভোট অধ্যাদেশের যে উদ্দেশ্য ছিল, তা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। গণভোট অনুষ্ঠিত হয়ে গেলে অধ্যাদেশের কার্যকারিতাও শেষ হয়। অতএব, ভবিষ্যতে এর অধীনে আর কোনো গণভোট হবে না। এজন্য এটিকে বিল আকারে নিয়ে আসার কোনো যৌক্তিকতা নেই।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির জারি করা অধ্যাদেশগুলো সংসদে উত্থাপন হয় এবং ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করে। তবে গণভোট অধ্যাদেশ সংবিধানের অংশ ছিল না, এটি নির্দিষ্ট গণভোটের জন্য প্রণীত হয়েছিল।
সরকারি দলের এই সিদ্ধান্তে জামায়াতে ইসলামী নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) জানিয়েছে। শুধু গণভোট অধ্যাদেশ নয়, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে অন্তত ১৫টি বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। এই অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে মানবাধিকার কমিশন, বিচারপতি নিয়োগ, গুম প্রতিরোধ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ সংশোধনের প্রস্তাবে জামায়াত আপত্তি জানিয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিশেষ কমিটির বৈঠকে ১৩৩টি অধ্যাদেশের ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। বেশিরভাগ অধ্যাদেশ মূল রূপেই পাস করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিছু অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে বিল হিসেবে সংসদে উপস্থাপন করা হবে। তবে সময় সীমাবদ্ধতার কারণে সবগুলোই আগামী ১০ তারিখের মধ্যে বিল আকারে আনা সম্ভব হবে না। বাকি অধ্যাদেশ পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে বিল আকারে উত্থাপিত হবে।
বিরোধী দলের ভিন্নমতের বিষয়েও মন্ত্রী বলেন, “কিছু অধ্যাদেশ নিয়ে বিশেষ কমিটিতে সরকারি দলেরও কয়েকজন সদস্য এবং বিরোধী দলের সদস্যরা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন। রিপোর্টে তাদের বক্তব্য যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত হবে। বিল যখন সংসদে উত্থাপন হবে, তখন প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পাঠের সময়ে সবাই তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করার সুযোগ পাবেন।”
তিনি আরও বলেন, ৩০ দিনের সময়সীমা শেষ হলে যে অধ্যাদেশ বা বিল সংসদে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে না, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। তবে প্রয়োজনীয় অধ্যাদেশ পরবর্তী সেশনে বিল আকারে নিয়ে আসা হবে। বিশেষ করে সীমানা নির্ধারণ বা আরপিও সংক্রান্ত অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ প্রভাব বিবেচনায় আইনে রূপান্তর করা অপরিহার্য।
নিম্নের টেবিলে বিশেষ কমিটিতে আলোচিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেখানো হলো:
| অধ্যাদেশ বিষয় | সরকারি দলের অবস্থান | বিরোধী দলের প্রতিক্রিয়া | পরবর্তী পদক্ষেপ |
|---|---|---|---|
| গণভোট অধ্যাদেশ | বিল আনা প্রয়োজন নেই | নোট অব ডিসেন্ট | কার্যকারিতা শেষ, বিল প্রয়োজন নেই |
| মানবাধিকার কমিশন | সংশোধিত বিল প্রস্তাব | আপত্তি | পরবর্তী সেশনে আলোচনা |
| বিচারপতি নিয়োগ | সংশোধিত বিল প্রস্তাব | আপত্তি | পরবর্তী সেশনে আলোচনা |
| গুম প্রতিরোধ | সংশোধিত বিল প্রস্তাব | আপত্তি | পরবর্তী সেশনে আলোচনা |
| দুর্নীতি দমন কমিশন | সংশোধিত বিল প্রস্তাব | আপত্তি | পরবর্তী সেশনে আলোচনা |
| সীমানা নির্ধারণ | বিল আনা প্রয়োজন | সম্মতি | ভবিষ্যৎ প্রভাব বিবেচনা |
বৈঠকটি সংসদের ক্যাবিনেট কক্ষে রাত সাড়ে ৮টায় শুরু হয়ে তিন ঘণ্টা স্থায়ী হয়। কমিটির সভাপতি ছিলেন জয়নুল আবেদীন, উপস্থিত ছিলেন চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, ড. মুহাম্মদ ওসমান ফারুক, এ এম মাহবুব উদ্দিন, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী, মুহাম্মদ নওশাদ জমির, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, মো. মুজিবুর রহমান, জামায়াতের পক্ষ থেকে মজিবুর রহমান এবং জিএম নজরুল ইসলাম। কমিটির আমন্ত্রণে অংশ নেন জামায়াতের মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান।
বিশেষ কমিটির সিদ্ধান্ত ও বিরোধী দলের মতপার্থক্য তুলে ধরার মাধ্যমে সরকার এবং বিরোধী দল উভয়ই সংবিধান ও প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেছে।
