সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একজাতীয় জাতীয় গণভোট দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। যদিও দেশের সর্বমোট স্তরে ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রাধান্য পেল, নির্বাচনী গণনা ত্রুটি ও অসমঞ্জস্য প্রকাশ্যে আসায় জনগণের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জাতীয় নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, দেশে মোট নিবন্ধিত ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১,২৭,৭২০,৩৩৪ জন। গণভোটে ভোট প্রদান করেছেন ৬০.২৬ শতাংশ ভোটার, যার মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের সংখ্যা ৪৮,০৭৪,৪২৯ এবং ‘না’ ভোটের সংখ্যা ২২,৫৬৫,৬২৭। এছাড়াও ৭,০২০,২৮৫টি ভোট বাতিল বা অকার্যকর হিসেবে গণ্য হয়েছে।
তবে কিছু আসনে ফলাফলে প্রচণ্ড ত্রুটি লক্ষ্য করা গেছে। রাজশাহী-৪ আসনে ভোটার উপস্থিতি ২৪৪.২৯৫ শতাংশ দেখানো হয়েছে, যা বাস্তবসম্মত নয়। এখানে ৩,১৯,৯০৯ নিবন্ধিত ভোটারের বিপরীতে ৭,৮১,৫২৩ ভোট গণনা করা হয়েছে, যার মধ্যে ‘না’ ভোট ৬,১২,২১৯ এবং ‘হ্যাঁ’ ভোট ১,৪৫,৩৮২। এই আসনে জামায়াত-এ-ইসলামীর আব্দুল বারী সরদার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
অপরদিকে সিরাজগঞ্জ-১ আসনে গণভোটের অংশগ্রহণ মাত্র ৭.৮৯৯ শতাংশ, যদিও সংসদীয় নির্বাচনে উপস্থিতি ছিল ৬০.৮৩ শতাংশ। নেত্রকোনা-৩, ৪ ও ৫ আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোটের সংখ্যা নিবন্ধিত ভোটারের চেয়ে বেশি দেখানো হয়েছে।
অঞ্চলভিত্তিক ভিন্নতা লক্ষ্যণীয়। খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবন পাহাড়ি জেলা এবং গোপালগঞ্জের তিনটি আসন-এ ‘না’ ভোট প্রাধান্য পেয়েছে। গোপালগঞ্জে ‘না’ ভোট ‘হ্যাঁ’র তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি।
নিম্নলিখিত টেবিলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আসনের বিস্তারিত উপস্থাপন করা হলো:
| জেলা / আসন | হ্যাঁ ভোট | না ভোট | নিবন্ধিত ভোটার | মন্তব্য |
|---|---|---|---|---|
| খাগড়াছড়ি | ১,৪৪,৩৫৫ | ১,৫৫,৯৪২ | ৩,০০,০০০+ | না ভোটের প্রাধান্য |
| রাঙ্গামাটি | ১,১২,২০৪ | ১,২০,৩১০ | ২,৫০,০০০+ | না ভোটের প্রাধান্য |
| বান্দরবন | ১৭,৯৮২ | ৩৬,৭২১ | ৫০,০০০+ | না ভোটের প্রাধান্য |
| গোপালগঞ্জ-১ | ৫৪,৭১৬ | ১,২৮,২৯৮ | ২,০০,০০০+ | না ভোটের প্রাধান্য |
| গোপালগঞ্জ-২ | ৩৪,৩০২ | ১,০৭,২৯০ | ২,০০,০০০+ | না ভোটের প্রাধান্য |
| গোপালগঞ্জ-৩ | ৩৩,৪৯৮ | ৯৩,৩৬৮ | ১,৫০,০০০+ | না ভোটের প্রাধান্য |
| রাজশাহী-৪ | ১,৪৫,৩৮২ | ৬,১২,২১৯ | ৩,১৯,৯০৯ | গণনা ত্রুটি |
| নেত্রকোনা-৩ | ৫,০২,৪৩৮ | – | ৪,২০,৬৮৬ | হ্যাঁ ভোট > ভোটার সংখ্যা |
| নেত্রকোনা-৪ | – | – | – | হ্যাঁ ভোট > ভোটার সংখ্যা |
| নেত্রকোনা-৫ | – | – | – | হ্যাঁ ভোট > ভোটার সংখ্যা |
জাতীয়ভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোট ৬২.৪৭ শতাংশ এবং ‘না’ ভোট ২৯.৩২ শতাংশ। যদিও রাজশাহী-৪ ও সিরাজগঞ্জ-১ এর ফলাফলে আংশিক সংশোধন আনা হয়েছে, নেত্রকোনা আসনের গণনার অসমঞ্জস্য এখনও অমীমাংসিত রয়েছে।
এই গণনা অনিয়ম ও আঞ্চলিক বৈষম্য দেশে নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং নাগরিক পর্যবেক্ষকরা নির্বাচনের প্রতিটি ধাপ নজরদারিতে রাখছেন এবং পূর্ণ পুনর্মূল্যায়ন ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধির আহ্বান জানাচ্ছেন।
সংক্ষেপে, যদিও জাতীয় পর্যায়ে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হয়েছে, গণনা ত্রুটি ও স্থানীয় অনিয়ম গণভোটের সার্বিক বিশ্বাসযোগ্যতায় গভীর সন্দেহ তৈরি করেছে।
