বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য এবং সাবেক মন্ত্রী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গণভোটের প্রাসঙ্গিকতা ও এর আইনগত ভিত্তি নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, বর্তমান সংবিধানে বা প্রচলিত আইনি কাঠামোতে গণভোটের কোনো দৃঢ় ভিত্তি নেই। ভোলা জেলার লালমোহন উপজেলার উত্তর বাজার এলাকার মদন মোহন মন্দির প্রাঙ্গণে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন।
বিশেষ গোষ্ঠীর প্রভাব ও বিএনপির অবস্থান
মেজর হাফিজ অভিযোগ করেন যে, গণভোটের এই ধারণাটি মূলত ঢাকার একটি বিশেষ ‘এলিট গোষ্ঠী’ সাধারণ মানুষের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দিয়েছে। তিনি মনে করেন, সাধারণ জনগণের আকাঙ্ক্ষার চেয়ে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়নই এখানে মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের বিষয়ে তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে দলগতভাবে বিএনপি গণভোটের এই প্রক্রিয়ার সাথে একমত ছিল না। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতির জটিলতা এবং দেশে নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করার স্বার্থে তারা কিছুটা নমনীয় হতে বাধ্য হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছিল যে, গণভোটে রাজি না হলে দেশে নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হবে না, এমনকি নির্বাচন প্রক্রিয়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। এই চরম বাস্তবতার মুখে অনেকটা নিরুপায় হয়েই বিএনপিকে ‘জুলাই সনদে’ স্বাক্ষর করতে হয়েছে।”
সংবিধান সংশোধন ও জনগণের ম্যান্ডেট
সংবিধানের কোনো মৌলিক পরিবর্তন বা সংশোধনের ক্ষেত্রে মেজর হাফিজ অত্যন্ত কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন। তার মতে, একটি দেশের সর্বোচ্চ আইন বা সংবিধান পরিবর্তনের অধিকার কেবল জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের। কোনো অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা বা বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংবিধানের আমূল পরিবর্তন গণতান্ত্রিক রীতির পরিপন্থী। তিনি সতর্ক করে বলেন যে, বাংলাদেশ এখনো এ ধরনের জটিল গণভোট ব্যবস্থার জন্য রাজনৈতিক বা সামাজিকভাবে প্রস্তুত নয়। যে পদ্ধতিতে বর্তমানে প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।
গণভোট ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার তুলনামূলক বিশ্লেষণ
নিচে গণভোট এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের পার্থক্যের একটি রূপরেখা দেওয়া হলো:
| বিষয় | গণভোট (Referendum) | সংসদীয় ব্যবস্থা (Parliamentary) |
| আইনি ভিত্তি | বর্তমানে বাংলাদেশের সংবিধানে এর সরাসরি কোনো বিধান নেই। | সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ এটি করতে পারে। |
| অংশগ্রহণ | সরাসরি জনগণের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট। | জনগণের প্রতিনিধি বা সংসদ সদস্যদের বিতর্ক ও ভোট। |
| জবাবদিহিতা | অনেক ক্ষেত্রে আবেগতাড়িত বা একপাক্ষিক হওয়ার ঝুঁকি থাকে। | প্রাতিষ্ঠানিক বিতর্ক ও যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ থাকে। |
| বর্তমান প্রেক্ষাপট | একটি বিশেষ গোষ্ঠীর প্রস্তাবনা হিসেবে সমালোচিত। | গণতান্ত্রিক ও দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের পথ হিসেবে বিবেচিত। |
মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদের এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ‘জুলাই সনদ’ এবং গণভোট নিয়ে বিএনপির এই ‘বাধ্য হওয়া’র বিষয়টি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। তিনি তার বক্তব্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ সবার এবং এখানে প্রতিটি ধর্মের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করাই বিএনপির মূল লক্ষ্য। তিনি আসন্ন দিনগুলোতে রাজপথে ঐক্যবদ্ধ থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে সবাইকে শামিল হওয়ার আহ্বান জানান।
