খিলক্ষেতে ইকরাম হত্যা: দুইজনের মৃত্যুদণ্ড

রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায় তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী ইকরাম হোসেন মোল্লা (২২) হত্যা মামলায় দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) ঢাকার ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত-এর বিচারক মো. সাব্বির ফয়েজ বহুল আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে লাশ গুমের অপরাধে প্রত্যেককে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে আরও তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন মো. সিদ্দিক (২৩) ও মো. শান্ত মিয়া (২২)। আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. রিয়াজ হোসেন রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। রায়ে বিচারক উল্লেখ করেন, উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ, জব্দকৃত আলামত, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং সাক্ষীদের জবানবন্দি বিশ্লেষণে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, পরিকল্পিত ও নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড সমাজে গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়; সুতরাং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অপরিহার্য।

ঘটনার পটভূমি

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৪ মে রাতে পাওনা টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে ইকরামকে বাসা থেকে ডেকে নেয় তার পরিচিত দুই তরুণ। পরে তাকে খিলক্ষেত থানাধীন পাতিরা ও ডুমনি এলাকার মাঝামাঝি বসুন্ধরা বালুর চরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে হাতুড়ি ও ভোঁতা বস্তু দিয়ে আঘাত করার পর এন্টিকাটার দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়। হত্যার পর লাশ গুমের উদ্দেশ্যে পাশের একটি ডোবায় ফেলে কচুরিপানা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়।

ঘটনার দুই দিন পর, ৬ মে পুলিশ ওই ডোবা থেকে ইকরামের মরদেহ উদ্ধার করে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। তদন্তে আর্থিক লেনদেনজনিত বিরোধ হত্যার মূল কারণ হিসেবে উঠে আসে। তদন্ত কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল থেকে রক্তাক্ত মাটি, ব্যবহৃত ধারালো অস্ত্রের অংশবিশেষ এবং ভিকটিমের ব্যক্তিগত সামগ্রী জব্দ করেন, যা ফরেনসিক পরীক্ষায় অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দেয়।

মামলা ও বিচারপ্রক্রিয়া

ঘটনার পর নিহতের বাবা মো. কবির হোসেন মোল্লা খিলক্ষেত থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে ২০২৩ সালের ২৬ নভেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি আদালত অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন। বিচার চলাকালে মোট ১৭ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন; তাদের মধ্যে ছিলেন তদন্ত কর্মকর্তা, ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক, আলামত জব্দকারী পুলিশ সদস্য ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী।

নিম্নে মামলার গুরুত্বপূর্ণ তারিখ ও অগ্রগতির সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো—

বিষয়তারিখ/তথ্য
হত্যার তারিখ৪ মে ২০২৩
মরদেহ উদ্ধার৬ মে ২০২৩
অভিযোগপত্র দাখিল২৬ নভেম্বর ২০২৩
অভিযোগ গঠন২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
সাক্ষীর সংখ্যা১৭ জন
রায় ঘোষণা২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আইনি বিশ্লেষণ ও প্রতিক্রিয়া

আইনজীবীরা জানিয়েছেন, রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ রয়েছে। তবে রায় ঘোষণার সময় আদালতকক্ষে উপস্থিত নিহতের পরিবার সন্তোষ প্রকাশ করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানান। আইনবিশেষজ্ঞদের মতে, পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডে মৃত্যুদণ্ডের রায় অপরাধ দমনে কঠোর বার্তা দেয় এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা জোরদার করে।

তারা আরও বলেন, তরুণদের মধ্যে আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা, বিরোধ দেখা দিলে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং পারিবারিক-সামাজিক পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। নচেৎ ক্ষুদ্র আর্থিক বিরোধও ভয়াবহ পরিণতির দিকে গড়াতে পারে—যার মর্মান্তিক উদাহরণ হয়ে থাকবে ইকরাম হোসেন মোল্লার এই হত্যাকাণ্ড।