ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির আকস্মিক মৃত্যুর পর দেশটির ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে অভিজ্ঞ রাজনীতিক আলী লারিজানি দ্রুতই কেন্দ্রীয় ভূমিকায় উঠে এসেছেন। রোববার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারে দেওয়া ভাষণে তিনি জানিয়েছেন, দেশ পরিচালনার জন্য একটি ‘অস্থায়ী পরিচালনা পরিষদ’ গঠন করা হবে, যা চলমান সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
খামেনির দীর্ঘ নেতৃত্বের অবসানের ফলে ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে লারিজানিকে সম্ভাব্য প্রধান কৌশলবিদ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত এক বছরে তিনি দেশের নিরাপত্তা কাঠামোর অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। পারমাণবিক আলোচনা, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
ইরানের একটি প্রভাবশালী ধর্মীয় পরিবারে জন্ম নেওয়া লারিজানি দীর্ঘদিন ধরেই শাসনব্যবস্থার অভ্যন্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে তাঁর ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনা ওঠে এবং যুক্তরাষ্ট্র তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তবুও তিনি পরমাণু চুক্তি-সংক্রান্ত আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
রোববারের ভাষণে লারিজানি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলেন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সক্রিয় হলে তাদের কঠোরভাবে দমন করা হবে। সাম্প্রতিক হামলায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ আবদুর রহিম মুসাভির মৃত্যুও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
লারিজানি সম্প্রতি সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং খামেনির ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। গত মাসে তিনি ওমানে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ পারমাণবিক আলোচনায় অংশ নেন। পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারে তিনি একাধিকবার মস্কো সফর করেছেন।
যদিও তিনি অনেক ক্ষেত্রে বাস্তববাদী অবস্থান প্রদর্শন করেছেন, বিশেষ করে পরমাণু ইস্যুতে, তবুও অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ দমনে তাঁর কঠোর ভূমিকা তাঁকে বিতর্কিত করেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, সাম্প্রতিক বিক্ষোভ দমনে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে, যদিও সরকার এ বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে।
লারিজানির রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রেক্ষাপট
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| পূর্ণ নাম | আলী লারিজানি |
| জন্ম | ১৯৫৮, নাজাফ, ইরাক |
| পারিবারিক পটভূমি | প্রভাবশালী ধর্মীয় পরিবার |
| সাবেক পদ | পার্লামেন্ট স্পিকার (২০০৮–২০২০) |
| বর্তমান ভূমিকা | নিরাপত্তা ও নীতিনির্ধারণে কেন্দ্রীয় ব্যক্তি |
| সাম্প্রতিক দায়িত্ব | সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব |
| আন্তর্জাতিক ভূমিকা | পরমাণু আলোচনা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ |
| বিতর্ক | বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা |
লারিজানির দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার তাঁকে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। তিনি একসময় রেভোল্যুশনারি গার্ডের সদস্য ছিলেন এবং ২০০৫ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত প্রধান পারমাণবিক আলোচক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০০৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত টানা ১২ বছর পার্লামেন্টের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যার সময়েই ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
তবে তাঁর রাজনৈতিক পথ সবসময় মসৃণ ছিল না। ২০২১ ও ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলেও ইরানের গার্ডিয়ান কাউন্সিল তাঁকে অযোগ্য ঘোষণা করে। তবুও বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে তিনি আবারও সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির অনুপস্থিতিতে ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণে লারিজানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তবে তাঁকে একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন, আন্তর্জাতিক চাপ এবং নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এই জটিল বাস্তবতায় তাঁর নেতৃত্ব কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
