খাওনের টাকা নেই, ওষুধ কিনতে পারছেন না শিল্পী সুফিয়া

লোকগানের প্রখ্যাত শিল্পী কাঙালিনী সুফিয়ার (প্রকৃত নাম টুনি হালদার) জীবন আজ এক ভীষণ আর্থিক ও শারীরিক সংকটে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন তিনি। উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে কিডনি ও হৃদ্‌রোগসহ শরীরে আরও কিছু জটিল রোগ বাড়ছে। এক সপ্তাহ ধরে বুকে প্রচণ্ড ব্যথা, মুখ ফুলে যাওয়াসহ ঠিকঠাক কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছে। ঈদ ঘনিয়ে আসছে, কিন্তু ঘরে বাজার নেই, ওষুধ কেনার মতো অর্থও নেই।

কথাগুলো নিজ মুখে বলছিলেন সুফিয়া, “চার মাসের বাসাভাড়া বাকি, খাওনের টাকা নেই, ওষুধ কিনব কই থাইকা।” কয়েক বছর ধরেই সংসার চলে ধারদেনার ওপর নির্ভর করে। দেনা মেটাতে তিনি পূর্ব জামসিংয়ের নিজের বাড়ি বিক্রি করেছিলেন। এখন উত্তর জামসিংয়ের ভাড়া বাসায় মানবেতর জীবন কাটছে তার।

ভাতার পরিস্থিতি

সরকারি ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের অনুদান বা ভাতা কাঙালিনী সুফিয়ার জীবনের একমাত্র নির্ভরযোগ্য সহায়ক ছিল। প্রতিবছর ৪২ হাজার টাকা ভাতা পেতেন তিনি। কিন্তু গত বছর তা হ্রাস হয়ে ১২ হাজার টাকায় নেমেছে।

উৎসপ্রাপ্ত অর্থ (প্রতি বছর)বর্তমান অবস্থা
সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও অসচ্ছল সংস্কৃতিসেবী ভাতা৪২,০০০ টাকাকমে ১২,০০০ টাকা
প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে মাসিক সহায়তা১০,০০০ টাকাঅন্তর্বর্তী সরকারী সময়ে বন্ধ

সুফিয়ার মেয়ে পুষ্প বেগম বলেন, “বছরে এই ভাতার টাকা পেলে কিছুটা কাজে লাগত। এখন আর সেই টাকা নেই। দোকান বাকি, ফার্মেসিতে বাকি—সবই সমস্যার মধ্যে।”

আয় নেই, কষ্ট বেড়েছে

ভাতার পাশাপাশি অনুষ্ঠান থেকে আয় চলত সংসার। তবে গত এক বছরে দেশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সংখ্যা কমায় আয় প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমেছে। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারি চ্যানেল থেকে ডাক এলেও গত পাঁচ মাসে কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পারেননি।

চিকিৎসা ও খাবার

কিডনি ও উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে আরও জটিল সমস্যা রয়েছে সুফিয়ার। প্রতি মাসে ৮-১০ হাজার টাকার ওষুধ প্রয়োজন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পুষ্টিকর খাবারও দরকার। কিন্তু অর্থাভাবে অনেকে দিন পর্যন্ত ঠিকঠাক খাবারও পায়নি। পুষ্প বলেন, “ভিক্ষুকের চেয়ে খারাপ অবস্থায় আছি আমরা। একবেলা খেয়ে আরেকবেলা খাবার হয় না। এই টাকার টেনশনে খাওয়া-দাওয়াও হয় না।”

জীবনের সংগ্রাম ও গান

চিকিৎসার জন্য ১৫ লাখ টাকা ধার করে ২০২০ সালে বাড়ি বিক্রি করতে হয়েছে। বর্তমানে ৩ শতাংশ জমি কিনেছেন উত্তর জামসিংয়ে। নতুন বাড়ি নির্মাণের মতো অর্থ নেই, তাই ভাড়া বাসায় থাকেন।

সংকটের মধ্যে থেকেও কাঙালিনী সুফিয়া কারও কাছে হাত পাততে চান না। তিনি গান গাইতে চান এবং তার জন্য মানুষের কাছে ডাক চাচ্ছেন। তিনি প্রথম আলোকে জানান, “এখনো আমি গান গাইতে পারি। সাহায্য চাই না, কেবল গান গাওয়ার সুযোগ দিন।”

শিল্পী জীবন ও সাফল্য

সুফিয়া রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার রামদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৪ বছর বয়সেই গ্রামের অনুষ্ঠানে গান করে মানুষের নজর কাড়েন। গুরু ছিলেন গৌর মহন্ত ও দেবেন খ্যাপা। হালিম বয়াতির কাছেও গান শিখেছেন। আজ পর্যন্ত ৩০টি জাতীয় ও ১০টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছেন। জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘কোনবা পথে নিতাইগঞ্জ যাই’, ‘বুড়ি হইলাম তোর কারণে’, ‘নারীর কাছে কেউ যায় না’, ‘আমার ভাটি গাঙের নাইয়া’।

শারীরিক ও আর্থিক সংকটে থাকা এই শিল্পীর জীবন আজ এক নাজুক মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে শুধু সহযোগিতা নয়, দেশের সংস্কৃতিকে বাঁচানোরও প্রশ্ন জাগছে।