ক্ষমতায় আসার দেড় মাসের মধ্যেই ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণে রেকর্ড

ক্ষমতায় আসার দেড় মাসের মধ্যেই ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণে রেকর্ড বৃদ্ধি দেখা গেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে শুধু ব্যাংক ব্যবস্থা থেকেই সরকার প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব ঘাটতি পূরণ ও চলমান ব্যয় নির্বাহের চাপেই এই ঋণনির্ভরতা বাড়ছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক সংকেত।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত তিন মাসে সরকারের মোট ব্যাংক ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকায়। এর মধ্যে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি, যা আগের ছয় মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বিশেষভাবে, ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত মাত্র দেড় মাসেই নেওয়া হয়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা।

ব্যাংক ঋণের সার্বিক চিত্র

সময়কালব্যাংক ঋণের পরিমাণ
গত ৬ মাসতুলনামূলক কম (আনুমানিক ভিত্তি)
জানুয়ারি–মার্চপ্রায় ৫৬,০০০ কোটি টাকা
১৬ ফেব্রুয়ারি–৩১ মার্চপ্রায় ৪১,০০০ কোটি টাকা
গত ১৪ মাস (মোট বৃদ্ধি)প্রায় ১.৭৫ লাখ কোটি টাকা

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত ১৪ মাসে সরকারের ব্যাংক ঋণ বেড়েছে প্রায় পৌনে দুই লাখ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদরা এটিকে অর্থনীতির জন্য একটি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতা হিসেবে দেখছেন।

রাজস্ব ঘাটতি ও ব্যয়চাপ

অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজস্ব আয় এবং সরকারের ব্যয়ের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৭১ হাজার কোটি টাকায়। অথচ একই সময়ে সরকারি ব্যয় কমেনি, বরং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাত ও উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে চাপ বাড়ছে।

বিশেষ করে জ্বালানি আমদানি ব্যয়, বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দেশের ব্যয় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

অর্থনীতিবিদদের সতর্কতা

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ দেশকে ঋণ ফাঁদের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাঁর মতে, ব্যয় সামাল দেওয়া প্রয়োজন হলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বাড়ানো।

তিনি আরও বলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও জ্বালানি খাতের চাপ সামাল দিতে সরকারকে ঋণ নিতে হচ্ছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

ব্যবসায়ী ও খাতভিত্তিক উদ্বেগ

ব্যবসায়ী নেতারাও এই ঋণনির্ভর অর্থনীতিকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে দুর্বল করে তোলে। তাঁর মতে, এই ঋণ ভবিষ্যতে পরিশোধের সময় সরকার বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়তে পারে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে তীব্র তারল্য সংকট চলছে। নতুন নীতিমালার কারণে অনেক ব্যবসায়ী প্রয়োজনীয় ঋণ পাচ্ছেন না। প্রায় ২৩টি ব্যাংকে বড় ধরনের মূলধন ঘাটতি রয়েছে, যা প্রায় ২ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ।

সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমিয়ে দিতে পারে, যার ফলে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যেতে পারে।

একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে, কারণ বাজারে তারল্য ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়বে।

উপসংহার

সব মিলিয়ে, ব্যাংক ঋণের এই দ্রুত বৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্বল্পমেয়াদে ব্যয় নির্বাহে এটি সহায়ক হলেও দীর্ঘমেয়াদে ঋণ নির্ভরতা কমানো এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এখন অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে।