ক্রিকেটকে নিয়ে যে কথাটি সবচেয়ে বেশি বলা হয়—“খেলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছুই বলা যায় না”—রায়পুরে ভারতের বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার জয়টি সেই কথাটাকেই যেন পুনরায় প্রমাণ করল। ভারতের ৩৫৮ রানের বিশাল সংগ্রহের পর স্টেডিয়ামের সিংহভাগ দর্শকই ধরে নিয়েছিলেন যে ম্যাচটি ভারতের ঘরেই থাকবে। কারণ যেভাবে বিরাট কোহলি এবং রুতুরাজ গায়কোয়াড় বড় ইনিংস গড়েছেন, তাতে ভারতকে ম্যাচের ফেভারিট বলা ছাড়া উপায় ছিল না। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা যে আরেক গল্প লিখতে চলেছে, তা কেউই তখন ভাবেননি।
ইনিংস শুরুর আগেই দক্ষিণ আফ্রিকার ড্রেসিং রুমে এক ধরনের শান্ত দৃঢ়তা কাজ করছিল। কোচিং স্টাফ ব্যাটসম্যানদের বোঝাচ্ছিল—এখানে পিচ ভালো, আউটফিল্ড দ্রুত, শুধু উইকেট ধরে রাখতে পারলেই রান আসবে। ব্যাটিং অর্ডারে প্রত্যেকের কাছে নির্দিষ্ট নির্দেশনা—কেউ অ্যাঙ্কর, কেউ গতি বাড়ানোর কাজ করবে।
মার্করাম ব্যাট করতে নামার আগেই নাকি বলেছিলেন—“৩৫৯ অসম্ভব নয়, অসম্ভবকে কঠিনই বলা যায়।” এবং তিনি সেটিই বাস্তবে প্রমাণ করে দেখালেন। তার প্রথম ২০ বল ছিল পুরোপুরি ইনিংস গড়ার প্রয়াস, তারপর থেকেই তিনি ধীরে ধীরে ছন্দে ওঠেন। বাভুমার সঙ্গে তার ১০১ রানের জুটি ছিল ক্লাসিক ওয়ানডে ব্যাটিংয়ের উদাহরণ। ব্যাকফুটে কাট, অফ ড্রাইভ, টাইমিংনির্ভর লফটেড শট—মার্করামের নান্দনিক ব্যাটিংয়ে ভারতীয় বোলাররা বারবার লাইনের বাইরে যেতে বাধ্য হন।
ব্রিটজকে মাঠে নামার পর পুরো চিত্রটা বদলাতে শুরু করে। তিনি ছিলেন স্থির, কৌশলগত, কিন্তু শট বেছে নিতে ছিলেন চমৎকার। কোহলির ফিল্ড প্লেসমেন্টের ফাঁক তিনি নিখুঁতভাবে ব্যবহার করেন। তার প্রতিটি রান ছিল উদ্দেশ্যমূলক। মার্করাম–ব্রিটজকে জুটি যখন ৭০ রান তুলে ফেলেছে, তখন ভারত বুঝে যায় ম্যাচ আর সোজা পথে নেই।
তরুণ ব্রেভিস এলো পরবর্তী ধাক্কা নিয়ে। তার ব্যাটিং ছিল আত্মবিশ্বাসে ভরা। ডিপ মিডউইকেটের ওপর বড় ছক্কা, স্কুপ শট, ব্যাকফুট থেকে হাওয়ায় তোলা কাট—সব মিলিয়ে তিনি ভারতীয় বোলিং লাইনআপকে যথেষ্ট বিহ্বল করে ফেলেন। ব্রেভিস আসলে এক ধরনের এনার্জি নিয়ে আসে, যা দলের মনোবল তাত্ক্ষণিকভাবে বাড়িয়ে দেয়।
ম্যাচের শেষ দিকে কিছুটা নাটক হয়। ব্রিটজকে আউট, ডি জর্জি মাঠ ছাড়লেন, স্কোরবোর্ডে চাপ। ভারত খেলায় ফেরার চেষ্টা করছে। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার ডাগআউট তখনও শান্ত। করবিন বশ মাউথগার্ড লাগিয়ে, গ্লাভস ঠিক করে মাঠে নামলেন। তাকে বলা হয়েছিল “ফিনিশ দ্য জব”—তিনি তা-ই করলেন। তার ১৫ বলে ২৯ রান, দুইটি ছক্কা ও কয়েকটি দ্রুত সিঙ্গেল দক্ষিণ আফ্রিকার জয় নিশ্চিত করে।
অথচ দিনের শুরুতে ভারতীয় ব্যাটিং ছিল উৎসবমুখর। কোহলি তার ৫৩তম ওয়ানডে সেঞ্চুরি করেন, যা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার ৮৪তম। শচীন টেন্ডুলকারের কিংবদন্তী ১০০ সেঞ্চুরির রেকর্ডের দিকে তিনি ধাপে ধাপে এগিয়ে চলেছেন। রুতুরাজও ছিল অনবদ্য—৮৩ বলে ১০৫ রান, নিখুঁত শট সিলেকশন, লাইন-লেন্থ পাঠ করার দক্ষতা—সবই মিলিয়ে দুর্দান্ত সেঞ্চুরি। ভারত যখন ৩৫৮ রান শেষ করে উঠে আসে, তখন মনে হচ্ছিল ম্যাচের রঙ নীল।
কিন্তু ক্রিকেট কখনো পূর্বাভাস মেনে চলে না। দক্ষিণ আফ্রিকা স্থিরতা, গতি এবং কৌশল নিয়ে রান তাড়া শিখিয়ে দিল—বিশ্ব ক্রিকেটকে আবারও মনে করিয়ে দিল চেজিং-এ তারা অন্যতম সেরা দল।
