কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI): সম্ভাবনার স্বর্ণযুগ, সঙ্গে বিপদের ছায়াও

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (Artificial Intelligence)—একটি সময় যা ছিল শুধু বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির বিষয়, আজ তা বাস্তবতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর গতিপথ বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা রাখে। এর সুফল যেমন বিশাল, তেমনি রয়েছে গুরুতর উদ্বেগ, নৈতিক প্রশ্ন এবং নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি। প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রাকে একদিকে বলা হচ্ছে স্বর্ণযুগ”, অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা সাবধান করছেন—“মানবতার অস্তিত্বের জন্য হুমকি হতে পারে এই প্রযুক্তি।”

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি ? আসছে স্বর্ণযুগ, সাথে ঝুকিও

বিজ্ঞানীর পূর্বাভাস গুগল চেয়ারম্যানের উদ্বেগ

বিশ্বখ্যাত তাত্ত্বিক পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং বহু আগেই সতর্ক করেছিলেন—“যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকে, তাহলে তা মানবজাতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে।”
এমনই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গুগলের সাবেক চেয়ারম্যান এরিক স্মিড। তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে ক্ষমতাবান প্রযুক্তি—যা মানুষকে চিকিৎসা, প্রতিরক্ষা, ব্যবসা এবং দৈনন্দিন জীবনে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু এরই মাধ্যমে মানুষের নিয়ন্ত্রণহীন ধ্বংসযজ্ঞ ঘটার আশঙ্কাও অমূলক নয়।

 

গুগলের ‘ডিপ মাইন্ড’ মানববুদ্ধিমত্তার টেক্কা

গুগলের গবেষণা প্রকল্প DeepMind AI এরই মধ্যে চমকপ্রদ সাফল্য দেখিয়েছে। ২০১৭ সালে তাদের তৈরি AlphaGo নামের একটি AI প্রোগ্রাম বিশ্বের সেরা গো খেলোয়াড়কে হারিয়ে দেয়। পাঁচটি ম্যাচের মধ্যে এটি চারটিতেই জয়ী হয়। শুধু গেম জয় নয়—প্রোগ্রামটি এমন কৌশল ও সিদ্ধান্তের প্রয়োগ করে, যা একে মানবসদৃশ ‘চিন্তাশক্তি’র প্রমাণ দেয়।

এমনই এক পরীক্ষায় গবেষকেরা লক্ষ্য করেন—দুটি রোবট নিজেদের গেম জেতাতে গিয়ে আচরণে আগ্রাসী হয়ে ওঠে। এই আচরণে বিজ্ঞানীরা উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন—যদি ভবিষ্যতে রোবট স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তারা কী আমাদের নির্দেশনা মেনে চলবে? নাকি নিজেরাই ‘সারভাইভাল ইন্সটিংক্ট’ দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করবে?

 

AI ও ‘ডিপ লার্নিং’: মানুষের মস্তিষ্কের প্রতিচ্ছবি

বর্তমান AI গবেষণায় মেশিন লার্নিংডিপ লার্নিং (Deep Learning) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি শাখা।

  • মেশিন লার্নিং যন্ত্রকে পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে শেখার ক্ষমতা দেয়
  • ডিপ লার্নিং, বিশেষ করে নিউরাল নেটওয়ার্ক, যন্ত্রকে মানুষের মতো চিন্তা করার কাঠামো প্রদান করে।

ফলে অনেক ক্ষেত্রে মানবিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই যন্ত্র নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এর ভালো দিক যেমন আছে—তেমনই রয়েছে একাধিক নৈতিক নিরাপত্তা ঝুঁকি

 

ডিপফেক ভুয়া বাস্তবতার ভয়াবহতা

AI-এর আরেকটি ভয়ংকর প্রয়োগ হলো ডিপফেক (Deepfake)—যেখানে কৃত্রিমভাবে তৈরি ভিডিও বা ছবি বাস্তবের মতো নিখুঁত দেখায়। এতে একজন ব্যক্তির মুখাবয়ব, কণ্ঠ বা শরীর অন্য কারো ভিডিওতে বসানো হয়, যাতে সাধারণ মানুষ তা বুঝতেই পারে না।

এআই প্রযুক্তির অগ্রগতিতে এই ডিপফেক ভিডিওগুলি এমন বাস্তবিক হয়ে উঠছে যে, মিথ্যাকে সত্য বলে বিশ্বাস করা হয়ে দাঁড়াচ্ছে এক বিপজ্জনক সামাজিক প্রবণতা। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, পর্নোগ্রাফি, ভুল তথ্য ছড়ানো—সব ক্ষেত্রেই এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে, যা গণতন্ত্র ও সমাজকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

 

AI যুদ্ধশক্তি: স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের দুশ্চিন্তা

এরিক স্মিড উল্লেখ করেছেন, এখন AI প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে
বিশেষ করে হাইপারসনিক মিসাইল-এর মতো প্রযুক্তিতে AI ত্বরিত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। এই আত্মনির্ভরতা অনেক বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
তাঁর মন্তব্য—“যদি AI ভুল শেখে, তাহলে যুদ্ধের সিদ্ধান্তও ভুল হতে পারে।”

স্মিড তাই চীন রাশিয়ার মতো দেশকে স্বয়ংক্রিয় পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধে আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সম্মত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

 

ঘাতক রোবট’ এবং আন্তর্জাতিক উদ্বেগ

জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এখন লেথাল অটোনোমাস উইপন সিস্টেম (LAWS)” বা ‘ঘাতক রোবট’ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
AI-চালিত এই অস্ত্রগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম এবং মানবীয় নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই হত্যা করতে পারে

২০২১ সালের জাতিসংঘের একটি প্যানেল জানায়, লিবিয়ায় প্রথমবারের মতো স্বয়ংক্রিয় ড্রোনের মাধ্যমে আক্রমণ চালানো হয়, যার পরিণতিতে এখন একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়নের আলোচনা চলছে।

তবে এই উদ্যোগে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ভারতসহ কিছু দেশের বিরোধিতা। ১২৫টি দেশের অংশগ্রহণে জেনেভায় অনুষ্ঠিত CCW (Convention on Certain Conventional Weapons) সম্মেলনেও কোনও কার্যকর সিদ্ধান্ত হয়নি।

 

AI এর বাজার ব্যবসায়িক সম্ভাবনা

বিশ্বজুড়ে AI খাতে বিনিয়োগ দিন দিন বেড়েই চলেছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান UBS-এর তথ্য অনুযায়ী,

২০২৫ সালের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের বাজার ৯০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে।

Amazon, Microsoft, Alphabet (Google) ইতোমধ্যে AI থেকে বিপুল পরিমাণ মুনাফা অর্জন শুরু করেছে। NVIDIA তৈরি করছে বিশেষ চিপসেট, যা AI প্রযুক্তির ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

 

মানবজাতির ভবিষ্যৎ নীতিগত সিদ্ধান্ত

বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৫ সালের মধ্যে রোবট ১০% মানবিক কাজ, আর ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় সব কাজ সম্পাদনে সক্ষম হয়ে উঠবে। এমন ভবিষ্যৎে নতুন আইন, মানবিক নীতিমালা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অপরিহার্য

এরিক স্মিড আশাবাদী হলেও বাস্তববাদী। তাঁর ভাষ্য:

“AI যেমন বিদ্যুৎ বা টেলিফোনের মতো এক যুগান্তকারী আবিষ্কার, তেমনি এটি যদি ভুল হাতে পড়ে, তখন তা ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠতে পারে।”

তিনি বলেন, “AI আমাদের উন্নতির সঙ্গী হতে পারে—তবে যদি এর উপর থেকে মানুষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়, তাহলে সেটি হবে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়।”

 

google news
গুগোল নিউজে আমাদের ফলো করুন

 

AI প্রযুক্তি মানুষকে যেমন নতুন দিগন্তে পৌঁছে দিতে পারে, তেমনি সেটি এক বিপজ্জনক অস্ত্রও হতে পারে। তাই এখনই সময় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে AI-এর গবেষণা, প্রয়োগ এবং ব্যবহার নিয়ে কঠোর নীতিমালা নৈতিক গাইডলাইন তৈরি করার।

এআই যেন মানুষকে নিয়ন্ত্রণ না করে, বরং মানুষের হাতে থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয়—এই নীতিতে একমত হওয়াই সময়ের দাবি।

Leave a Comment