কুষ্টিয়ায় সংসদ সদস্যের ‘মোরাল পুলিশিং’: বিতর্কের মুখে আমির হামজা

কুষ্টিয়া জেলায় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা আমির হামজার বিরুদ্ধে ‘রমজানের পবিত্রতা রক্ষা’র দোহাই দিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর ‘মোরাল পুলিশিং’ বা নীতি পুলিশি চালানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর এই বিতর্ক দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় তুলেছে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, সংসদ সদস্যের উপস্থিতিতে এক পুলিশ কর্মকর্তা দোকানিদের কঠোর ভাষায় শাসাচ্ছেন, যা নাগরিক অধিকার ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পরিপন্থী বলে মনে করছেন আইন বিশ্লেষকরা।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও ভাইরাল ভিডিওর সারসংক্ষেপ

ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওতে দেখা যায়, কুষ্টিয়া সদর উপজেলার একটি এলাকায় সংসদ সদস্য আমির হামজা তার বেশ কিছু অনুসারী এবং পুলিশ সদস্যদের নিয়ে টহল দিচ্ছেন। সেখানে পাটিকাবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ মসিউল আজমকে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে দোকানিদের ধমকাতে শোনা যায়। তিনি চিৎকার করে বলেন, “কোনো ক্যারাম, কোনো টিভি চলবে না। এককথায় শেষ, রমজান মাস।” এই সময় সংসদ সদস্য আমির হামজাকে পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে দেখা যায়। ভিডিওটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেকেই একে ব্যক্তিগত পরিসরে অনধিকার চর্চা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে অভিহিত করেছেন।

প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও পুলিশের অবস্থান

বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলে কুষ্টিয়া জেলা পুলিশ প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। বিধি বহির্ভূত ও অপেশাদার আচরণের দায়ে পাটিকাবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মসিউল আজমকে তার দায়িত্ব থেকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করে কুষ্টিয়া পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়েছে। অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা দাবি করেছেন যে, তিনি ‘ওপরের নির্দেশে’ এমন কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন। তবে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন এই দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন।

ঘটনার প্রধান পক্ষগুলোর অবস্থান ও বক্তব্য নিচের টেবিলে তুলে ধরা হলো:

পক্ষমূল বক্তব্য ও অবস্থানবর্তমান অবস্থা/পদক্ষেপ
আমির হামজা (এমপি)মোরাল পুলিশিং নয়, বরং ‘দ্বীনের প্রতি দায়’ থেকে নামাজের সময় বিনোদন বন্ধ রাখতে বলেছেন।ঘটনার দায় স্বীকার করেছেন কিন্তু নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেননি।
মসিউল আজম (পুলিশ)দাবি করেছেন যে, তিনি ‘ওপরের নির্দেশে’ দোকানিদের হুঁশিয়ার করেছেন।ক্লোজড বা পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়েছে।
জসীম উদ্দিন (এসপি)পুলিশের পক্ষ থেকে এমন কোনো নির্দেশনা ছিল না। এমপির উপস্থিতিতে তার কথাটিই পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন।বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।
স্থানীয় দোকানি ও জনতাআইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ।এলাকায় চাপা আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজমান।

‘দ্বীনের প্রতি দায়’ বনাম নাগরিক অধিকার

বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা সংসদ সদস্য আমির হামজা তার কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করে গণমাধ্যমকে জানান, তিনি কেবল মুসলমানদের নামাজের সময়টুকুতে দোকানে টিভি বা ক্যারাম খেলা বন্ধ রাখতে অনুরোধ করেছেন। তার মতে, এটি কোনো আইনি জবরদস্তি নয় বরং ‘দ্বীনের প্রতি দায়’ থেকে করা একটি আহ্বান। তবে সমালোচকরা বলছেন, একজন আইনপ্রণেতা যখন ইউনিফর্ম পরা পুলিশ নিয়ে দোকানে গিয়ে ধমকের সুরে কথা বলেন, তখন সেটি আর ‘আহ্বান’ থাকে না, বরং তা পরিষ্কার হুমকিতে রূপ নেয়।

এরই মধ্যে অন্য একটি ভিডিওতে তাকে “খবরওয়ালা” নামক একটি অনলাইন পোর্টালের নাম উল্লেখ করে উক্ত প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য করতে দেখা গেছে। তিনি সংশ্লিষ্টদের “মেরে ফেলা উত্তম” বলে বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে সচেতন মহলে সমালোচিত হয়েছেন। উল্লেখ্য যে, উক্ত সংবাদ মাধ্যমটি কেবল জনস্বার্থে তার বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর ও বিতর্কিত বক্তব্য জনসমক্ষে তুলে ধরেছিল।

উপসংহার

গণতান্ত্রিক দেশে নাগরিকরা তাদের ব্যক্তিগত পরিসরে কী করবেন, তা দেশের প্রচলিত আইন দ্বারা নির্ধারিত হয়। পবিত্র রমজান মাসে ধর্মীয় অনুশাসন পালন করা ব্যক্তিগত ইবাদতের অংশ হলেও, রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ব্যবহার করে কাউকে জবরদস্তি করা সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী। কুষ্টিয়ার এই ঘটনাটি জনপ্রতিনিধি ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে ক্ষমতার অপব্যবহারের একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দাঁড়িয়েছে। যদিও পুলিশ প্রশাসন বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়েছে, তবে রাজনৈতিক প্রভাবে এমন কর্মকাণ্ড ভবিষ্যতে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।