খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ই ডিসেম্বর ২০২৫, ১:৪ পিএম
উত্তরাঞ্চলের সীমান্তঘেঁষা জেলা কুড়িগ্রামে শীতের তীব্রতা দিন দিন বাড়ছে। হিমেল উত্তরীয় বাতাস ও ঘন কুয়াশার দাপটে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। গত কয়েক দিন ধরে সূর্যের দেখা মিলছে না বললেই চলে। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে গোটা জেলা, যা সকাল পর্যন্ত স্থায়ী থাকছে। এর ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে এবং সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন শ্রমজীবী, কৃষক ও নিম্ন আয়ের মানুষরা।
আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন দিন ধরে কুড়িগ্রামে তাপমাত্রা ১২ থেকে ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যেই ঘোরাফেরা করছে। বুধবার (৩ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১২ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কুড়িগ্রামের রাজারহাট আবহাওয়া কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র জানান, উত্তর দিক থেকে আসা শীতল বাতাস এবং আর্দ্রতার কারণে ঘন কুয়াশা তৈরি হচ্ছে, যা আপাতত আরও কয়েক দিন থাকতে পারে।
Table of Contents
কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ধরলা নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলে বসবাসকারী দরিদ্র মানুষদের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। এসব এলাকায় বসতঘর অধিকাংশই টিন বা বাঁশের তৈরি হওয়ায় শীত ঠেকানোর মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। অনেক পরিবারে শীতবস্ত্রের অভাব প্রকট। রাতভর কনকনে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে কাটছে তাদের সময়।
চরাঞ্চলের বাসিন্দারা জানান, কাজ না করলে পেট চালানো যায় না, অথচ শীতের কারণে ভোরে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। দিনমজুর, নৌকার মাঝি ও কৃষিশ্রমিকরা কাজে যেতে না পারায় আয় কমে যাচ্ছে। ফলে সংসার চালানো নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।
শহর ও গ্রাম—উভয় এলাকাতেই শ্রমজীবী মানুষের কষ্ট চোখে পড়ার মতো। ভোরে ইটভাটা, হাটবাজার, নির্মাণকাজ কিংবা কৃষিকাজে বের হওয়া মানুষদের অনেককেই দেখা যাচ্ছে পাতলা কাপড়ে শীত সামলানোর চেষ্টা করতে। শীতের কারণে কাজের সময় কমে যাওয়ায় দৈনিক আয়ে প্রভাব পড়ছে।
এদিকে কুয়াশার কারণে সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। সকালে কুয়াশার ঘনত্ব বেশি থাকায় দূরপাল্লার যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করছে, কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে বন্ধও থাকছে। শিক্ষার্থীরাও ভোগান্তিতে পড়েছে। শীতের সকালে স্কুলে যেতে কষ্ট হচ্ছে, বিশেষ করে ছোট শিশুদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন।
কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ঠান্ডাজনিত জ্বর, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট এবং ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগী বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও বয়স্করা।
চিকিৎসকদের পরামর্শ, এই শীতে শিশু ও বৃদ্ধদের উষ্ণ রাখতে হবে, ঠান্ডা বাতাস থেকে দূরে রাখতে হবে এবং প্রয়োজন ছাড়া ভোর বা গভীর রাতে বাইরে বের হওয়া এড়িয়ে চলতে হবে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, শীত মোকাবিলায় প্রাথমিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রামের ৯টি উপজেলায় শীতবস্ত্র বিতরণের জন্য মোট ৫৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ দিয়ে কম্বল ও অন্যান্য শীতবস্ত্র কেনা হবে, যা পর্যায়ক্রমে দুস্থ ও অসহায় মানুষের মাঝে বিতরণ করা হবে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, শীতবস্ত্র বিতরণ আরও দ্রুত ও ব্যাপক পরিসরে করা প্রয়োজন, বিশেষ করে চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকায়।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| জেলা | কুড়িগ্রাম |
| সর্বনিম্ন তাপমাত্রা | ১২.৩° সেলসিয়াস |
| তাপমাত্রার প্রবণতা | ১২–১৩° সেলসিয়াস |
| প্রধান সমস্যা | শীত ও ঘন কুয়াশা |
| সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত | চরাঞ্চলের দরিদ্র মানুষ |
| শীতবস্ত্র বরাদ্দ | ৫৪ লাখ টাকা |
| বরাদ্দপ্রাপ্ত উপজেলা | ৯টি |
আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, উত্তরাঞ্চলে শীতের তীব্রতা আরও বাড়তে পারে। জানুয়ারি মাসে শৈত্যপ্রবাহের আশঙ্কাও রয়েছে। তাই এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে, কুড়িগ্রামে শীত এখন শুধু আবহাওয়ার বিষয় নয়, এটি একটি মানবিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। শীতের এই সময়ে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সহায়তা জরুরি। দ্রুত ও সুষ্ঠুভাবে শীতবস্ত্র বিতরণ এবং স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা গেলে দুর্ভোগ কিছুটা হলেও কমবে—এমনটাই আশা করছেন কুড়িগ্রামবাসী
মন্তব্য