কুড়িগ্রামে বীর প্রতীক তারামন বিবিকে স্মরণে দোয়া ও শ্রদ্ধা

কুড়িগ্রামে যথাযোগ্য মর্যাদা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে বীর প্রতীক তারামন বিবির সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়েছে। সোমবার দুপুরে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের আরাজী পলাশবাড়ী এলাকায় তাঁর নিজ বাসভবনে বাদ যোহর মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য, ধর্মপ্রাণ মুসল্লি ও এলাকাবাসী অংশ নেন। দোয়া পরিচালনা করেন আরাজী পলাশবাড়ী দারুস সালাম জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ও প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং দেশ ও জাতির কল্যাণে বিশেষ মোনাজাত করেন।

একই দিনে কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলায় বীর প্রতীক তারামন বিবির কবরস্থানে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানানো হয়। প্রশাসনের প্রতিনিধি দল তাঁর সমাধিতে দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বীরত্বের আদর্শ নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। এ সময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।

তারামন বিবির জীবনগাথা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। দারিদ্র্যপীড়িত গ্রামীণ পরিবেশে জন্ম নেওয়া এই সাহসী নারী কৈশোরেই সংগ্রামী হয়ে ওঠেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন—যা আজও বিস্ময় জাগায়। শুরুতে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের রান্না, পাহারা ও বার্তা আদান–প্রদানের মতো দায়িত্ব পালন করলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর সাহস ও নিষ্ঠা তাঁকে সম্মুখসমরের দিকে টেনে নেয়। বিভিন্ন অভিযানে তিনি সরাসরি অংশ নেন, অস্ত্র বহন ও শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের দায়িত্বও পালন করেন।

মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৩ সালে তাঁকে ‘বীর প্রতীক’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। তবে দুঃখজনকভাবে দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও তথ্যপ্রবাহের ঘাটতির কারণে তিনি নিজেই এই সম্মানের কথা জানতে পারেননি। প্রায় ২৫ বছর পর তিনি প্রথমবারের মতো জানতে পারেন যে, রাষ্ট্র তাঁকে বীরত্বের স্বীকৃতি দিয়েছে। এই ঘটনা আমাদের প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা ও ইতিহাস সংরক্ষণের দুর্বলতাকেও স্মরণ করিয়ে দেয়।

২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর বীর প্রতীক তারামন বিবি ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশ একজন সাহসী কন্যাকে হারায়। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে দাফন করা হয়, যা তাঁর বীরত্বপূর্ণ জীবনের প্রতি জাতির সম্মান ও কৃতজ্ঞতার প্রতীক। তাঁর জীবন ও সংগ্রাম আজও নারী মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান নিয়ে আলোচনা ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা হিসেবে বিবেচিত।

নিচের টেবিলে বীর প্রতীক তারামন বিবির জীবনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—

বিষয়তথ্য
জন্মস্থানকুড়িগ্রাম জেলা
মুক্তিযুদ্ধে যোগদান১৪ বছর বয়সে
ভূমিকারান্না, বার্তা বহন, সম্মুখযুদ্ধ
খেতাববীর প্রতীক (১৯৭৩)
খেতাব জানার সময়প্রায় ২৫ বছর পর
মৃত্যু১ ডিসেম্বর ২০১৮
দাফনরাষ্ট্রীয় মর্যাদায়

সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকীর এই আয়োজন কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা। তারামন বিবির মতো বীরদের আত্মত্যাগ স্মরণ করে নতুন প্রজন্ম দেশপ্রেম, সাহস ও ন্যায়ের পথে অনুপ্রাণিত হবে—এমন প্রত্যাশাই ব্যক্ত করেন আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীরা। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, বয়স বা সামাজিক অবস্থান নয়—দেশপ্রেম ও দৃঢ় সংকল্পই ইতিহাস গড়ে।