উত্তর আমেরিকার ফুটবল যখন ২০২৬ বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের মেলে ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই এক চাঞ্চল্যকর খবর নিয়ে হাজির হয়েছে কানাডা সকার (Canada Soccer)। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বিবাদ ও বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে সংস্থাটি তাদের বিতর্কিত বাণিজ্যিক অংশীদার ‘কানাডিয়ান সকার বিজনেস’ (CSB)-এর সাথে চুক্তির মেয়াদ আরও ১১ বছর বাড়িয়েছে। ২০৩৭ সাল পর্যন্ত বলবৎ থাকা এই নতুন চুক্তিতে কানাডা সকারের জন্য আগের চেয়ে অনেক বেশি অনুকূল শর্ত ও আর্থিক সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে।
দীর্ঘস্থায়ী বিবাদ ও সমঝোতার প্রেক্ষাপট
কানাডা সকারের সাথে সিএসবি-র মূল চুক্তিটি দীর্ঘদিন ধরেই খেলোয়াড় এবং সমর্থকদের মাঝে তীব্র অসন্তোষের কারণ ছিল। ২০১৮ সালে স্বাক্ষরিত সেই ১০ বছর মেয়াদী চুক্তিতে কানাডা সকার বছরে মাত্র ৩০ লাখ ডলারের মতো অর্থ পেত, যা জাতীয় দলগুলোর খরচ মেটাতে অপর্যাপ্ত ছিল। এই আর্থিক সংকটের কারণে ২০২২ সালে কানাডার পুরুষ জাতীয় দল পানামার বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচ বয়কট করে। তাদের দাবি ছিল বিশ্বকাপের প্রাইজমানির ন্যায্য অংশ, উন্নত ভ্রমণ সুবিধা এবং নারী দলের সমান ম্যাচ ফি প্রদান করা।
অন্যদিকে, টোকিও অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জয়ী সফল নারী দলটিও চরম অর্থকষ্টে ভুগছিল। ২০২৩ সালের ‘শি-বিলিভস কাপ’-এর প্রস্তুতি ক্যাম্পে মাত্র ২০ জন খেলোয়াড়কে আমন্ত্রণ জানানো হলে জাতীয় পর্যায়ে তোলপাড় শুরু হয়। পরিস্থিতি এতটাই জটিল রূপ নেয় যে, খেলোয়াড় অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড সদস্যদের বিরুদ্ধে ৪ কোটি ডলারের মামলা পর্যন্ত দায়ের করেছিল। সেই তিক্ত অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে এবার নতুন আঙ্গিকে যাত্রা শুরু করছে দুই পক্ষ।
নিচে পুরনো এবং নতুন চুক্তির মধ্যকার প্রধান পরিবর্তনগুলো একটি সারণির মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | পুরনো চুক্তি (২০১৮) | নতুন চুক্তি (২০২৬-২০৩৭) |
| বার্ষিক গড় আয় | প্রায় ৩.৪ মিলিয়ন ডলার | উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি (গোপন রাখা হয়েছে) |
| সময়সীমা | ১০ বছর | ১১ বছর (২০৩৭ পর্যন্ত), ৫ বছর বাড়ানোর সুযোগসহ |
| রাজস্ব মডেল | নির্দিষ্ট ফি ভিত্তিক | নতুন ‘রেভিনিউ শেয়ারিং’ বা রাজস্ব ভাগাভাগি মডেল |
| প্রচারণা সুবিধা | সীমিত সম্প্রচার সুবিধা | সকল আন্তর্জাতিক ম্যাচ লাইভ সম্প্রচারের প্রতিশ্রুতি |
| সমতা বিধান | নারী ও পুরুষ দলের মাঝে বৈষম্য | উভয় দলের জন্য সমান প্রচার ও এক্সপোজার নিশ্চিতকরণ |
| পর্যালোচনা | নির্দিষ্ট পর্যালোচনা ব্যবস্থা ছিল না | প্রতি ৩ বছর অন্তর বাজারমূল্য যাচাই ও পর্যালোচনা |
নতুন চুক্তির মূল বৈশিষ্ট্য ও নেতৃত্ব
নতুন এই চুক্তির অধীনে সিএসবি-র নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘কানাডিয়ান সকার মিডিয়া অ্যান্ড এন্টারটেইনমেন্ট’ (CSME)। এই পুনর্গঠনের নেতৃত্বে রয়েছেন ফুটবল অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধান নির্বাহী জেমস জনসন এবং কানাডা সকারের প্রধান নির্বাহী কেভিন ব্লু। তাদের আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল ফুটবল থেকে আসা লভ্যাংশের একটি বড় অংশ সরাসরি খেলোয়াড় এবং মাঠের উন্নয়নে ব্যয় করা।
কেভিন ব্লু এই নতুন চুক্তি সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “নতুন এই কাঠামোর মাধ্যমে কানাডা সকার বাণিজ্যিকভাবে অনেক বেশি লাভবান হবে। এটি আমাদের খেলাধুলার উন্নতির জন্য একটি পরিষ্কার পথ তৈরি করেছে, যা আগামী বছরগুলোতে আমাদের আরও শক্তিশালী করবে।” চুক্তির নতুন শর্তানুযায়ী, কানাডায় অনুষ্ঠিত সকল আন্তর্জাতিক ম্যাচ এবং কানাডীয় সময় অঞ্চলের অনুকূলে থাকা ম্যাচগুলো সরাসরি টেলিভিশনে সম্প্রচার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বিশ্বকাপের হাতছানি ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
২০২৬ বিশ্বকাপ যখন দরজায় কড়া নাড়ছে, তখন অভ্যন্তরীণ এই কোন্দল মিটিয়ে ফেলা কানাডীয় ফুটবলের জন্য একটি বিশাল স্বস্তির বিষয়। তবে সমালোচকরা এখনও সন্দিহান যে, দীর্ঘমেয়াদী এই চুক্তি ভবিষ্যতে পরিবর্তিত বাজারমূল্যের সাথে তাল মেলাতে পারবে কি না। যদিও প্রতি ৩ বছর অন্তর শর্ত পর্যালোচনার বিধান রাখা হয়েছে, তবুও মাঠের সাফল্যের সাথে পাল্লা দিয়ে আর্থিক ভিত্তি কতটা মজবুত হয়, তাই এখন দেখার বিষয়।
