কানাডার যুবরাজের ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি

নামের মাহাত্ম্য কি কেবল সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ, নাকি কখনো কখনো নামের সঙ্গে জড়িয়ে যায় নিয়তিরও বিশেষ ছোঁয়া? চেন্নাইয়ের এম এ চিদম্বরম স্টেডিয়ামের স্কোরবোর্ডে ‘যুবরাজ সিং’ নামটি দেখে অনেকেরই চোখ কপালে উঠেছিল। মুহূর্তের জন্য মনে হতেই পারে—এ কি সেই ভারতের ২০১১ বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি? কিন্তু না, তিনি ভিন্ন একজন—কানাডার ১৯ বছর বয়সী বাঁহাতি ওপেনার যুবরাজ সিং সামরা।

নামটি তাঁর বাবা বলজিৎ সামরার দেওয়া। ভারতীয় ক্রিকেটের সাবেক তারকা যুবরাজ সিংয়ের ভক্ত ছিলেন তিনি। শুধু নামেই নয়, ছেলেকে ছোটবেলা থেকেই বাঁহাতি ব্যাটসম্যান হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। সেই স্বপ্ন যে একদিন আন্তর্জাতিক মঞ্চে এমনভাবে আলো ছড়াবে, তা হয়তো কল্পনাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

রেকর্ড ভাঙার ইনিংস

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ‘ডি’ গ্রুপে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে যুবরাজ যা করলেন, তা নিছক একটি সেঞ্চুরি নয়—এ যেন সহযোগী দেশগুলোর ক্রিকেট ইতিহাসে এক স্পষ্ট ঘোষণা। মাত্র ৬৫ বলে ১১০ রানের ইনিংসে ছিল ১১টি চার ও ৬টি ছক্কা। তাঁর স্ট্রাইক রেট ছিল প্রায় ১৬৯.২৩—চিপকের মন্থর উইকেটে যা সত্যিই বিস্ময়কর।

মাত্র ৩৬ বলে হাফ সেঞ্চুরি পূর্ণ করে তিনি শুরু থেকেই কিউই বোলারদের চাপে রাখেন। ম্যাট হেনরির প্রথম স্পেলে টানা দুই চারে আত্মবিশ্বাসী সূচনা, এরপর জিমি নিশামের ওভারে ১৮ রান—প্রতিটি আক্রমণেই ছিল নিয়ন্ত্রিত আগ্রাসন।

ইনিংসের সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান

বিষয়তথ্য
রান১১০
বল৬৫
চার১১
ছক্কা
স্ট্রাইক রেট১৬৯.২৩
বয়স১৯ বছর ১৪১ দিন

ইতিহাসের পাতায় নাম

১৯ বছর ১৪১ দিন বয়সে সেঞ্চুরি করে যুবরাজ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ইতিহাসে সহযোগী দেশের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান। পাশাপাশি তিনি এই প্রতিযোগিতার কনিষ্ঠতম সেঞ্চুরিয়ান হিসেবেও নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছেন। পূর্বের রেকর্ডধারী পাকিস্তানের আহমেদ শেহজাদের কীর্তি পেছনে ফেলেছেন তিনি। এমনকি ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি—দুই ধরনের বিশ্বকাপ মিলিয়েও তিনি এখন সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান।

অধিনায়ক দিলপ্রীত বাজওয়ার সঙ্গে তাঁর উদ্বোধনী জুটিতে আসে ১১৬ রান, যা কোনো সহযোগী দেশের পক্ষে পূর্ণ সদস্য দেশের বিপক্ষে সর্বোচ্চ উদ্বোধনী জুটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ব্র্যাম্পটন থেকে বিশ্বমঞ্চে

কানাডার ব্র্যাম্পটনে জন্ম নেওয়া পাঞ্জাবি বংশোদ্ভূত যুবরাজের ক্রিকেটে হাতেখড়ি টরন্টো ডিস্ট্রিক্ট লিগে। আন্তর্জাতিক অভিষেকের পর থেকেই ঝড়ো ব্যাটিংয়ের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। বাহামার বিপক্ষে ১৫ বলে হাফ সেঞ্চুরি করে তিনি প্রথম আলোচনায় আসেন। তবে চেন্নাইয়ের মন্থর উইকেটে নিউজিল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে এই সেঞ্চুরি তাঁকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল।

ম্যাচের ফলাফল

কানাডা আগে ব্যাট করে ৪ উইকেটে ১৭৩ রান তোলে। জবাবে নিউজিল্যান্ড ৮ উইকেটে জয় পায় ২৯ বল হাতে রেখেই। তৃতীয় উইকেটে গ্লেন ফিলিপস ও রাচিন রবীন্দ্রর ৭৩ বলে অবিচ্ছিন্ন ১৪৬ রানের জুটি ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

তবু দিনের শেষে ফলাফলের চেয়ে বেশি আলোচনায় যুবরাজ। চিপকের দর্শকেরা দেখেছেন এক তরুণকে, যিনি শুধু নামের মিল দিয়ে নয়—নিজস্ব প্রতিভা, আত্মবিশ্বাস ও দাপুটে ব্যাটিং দিয়েই বিশ্ব ক্রিকেটে নিজের পরিচয় ঘোষণা করেছেন। কানাডার ক্রিকেট ইতিহাসে এই দিনটি তাই পরাজয়ের নয়, সম্ভাবনার নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।