করোনা বনাম শাসন—শিক্ষার ক্ষতি

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে শিক্ষা খাত এক অভূতপূর্ব দ্বিমুখী সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। একদিকে বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯, অন্যদিকে ড. মুহাম্মদ ইউনুস-এর নেতৃত্বাধীন শাসনপর্বে উদ্ভূত প্রশাসনিক ও সামাজিক অস্থিরতা—এই দুইয়ের সম্মিলিত অভিঘাতে শিক্ষাব্যবস্থা গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এদের প্রকৃতি, বিস্তার এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভিন্ন হওয়ায় প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে: সবচেয়ে গভীর ক্ষতি কোন উৎস থেকে এসেছে?

করোনা মহামারির সময় প্রায় দুই বছর দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। এতে আনুমানিক ৩.৫ থেকে ৩.৭ কোটি শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষের বাইরে চলে যায়। অনলাইন ক্লাস, টেলিভিশনভিত্তিক পাঠদান এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের মাধ্যমে বিকল্প ব্যবস্থা চালু করা হলেও তা সর্বস্তরে কার্যকর হয়নি। গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইন্টারনেট ও ডিভাইসের সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে শিক্ষার ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ে, শেখার ঘাটতি তৈরি হয় এবং ড্রপআউটের হার বেড়ে যায়।

মহামারি-পরবর্তী পরিসংখ্যান এই ক্ষতির গভীরতা নির্দেশ করে:

সূচকআনুমানিক পরিমাণ
মোট শিক্ষার্থী প্রভাবিত৩.৫–৩.৭ কোটি
স্কুল বন্ধের সময়কালপ্রায় ১৮–২৪ মাস
ছেলে শিক্ষার্থীর অনিয়মিত প্রত্যাবর্তন~৫৯%
মেয়েদের ড্রপআউট হার~২০%
বিকল্প শিক্ষা ব্যবস্থাআংশিক সফল

এই সময় শিশু শ্রম ও বাল্যবিবাহের হারও বেড়ে যায়, যা শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক চাপ সৃষ্টি করে। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—এই সংকট ছিল বৈশ্বিক এবং অনিবার্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি উন্নত হয়; ২০২৩–২০২৪ সালে পুনরায় নিয়মিত পরীক্ষা, শ্রেণিকক্ষভিত্তিক পাঠদান এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি পেতে শুরু করে।

অন্যদিকে, ২০২৪ সালে নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষা খাতে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা সাময়িক বিপর্যয়কে অতিক্রম করে কাঠামোগত দুর্বলতায় রূপ নেয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তথাকথিত “মব সংস্কৃতি” বিস্তার লাভ করে—শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ঘেরাও, শারীরিক ও মানসিক হয়রানি, সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের ঘটনা বাড়তে থাকে। এ ধরনের ঘটনা শুধু সরকারি নয়, বেসরকারি ও এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানেও ছড়িয়ে পড়ে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও দৃশ্যমান প্রশাসনিক উদ্যোগের ঘাটতি স্পষ্ট ছিল। বরং অনেক ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলাকে নীরব প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে বলে সমালোচনা উঠে। এর ফলে শিক্ষক সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, প্রশাসনিক কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে এবং নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হতে থাকে।

প্রভাবের ক্ষেত্রকরোনার সময়পরবর্তী অস্থিরতা
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানবন্ধখোলা কিন্তু অস্থিতিশীল
শেখার ঘাটতিউচ্চক্রমবর্ধমান
শৃঙ্খলানিয়ন্ত্রিতভেঙে পড়ে
শিক্ষক নিরাপত্তাতুলনামূলক স্থিতিশীলঝুঁকিপূর্ণ
পুনরুদ্ধার সম্ভাবনাসম্ভবকঠিন

শিক্ষা ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা কেবল আনুষ্ঠানিক বিষয় নয়; এটি নাগরিক গঠনের মৌলিক ভিত্তি। কিন্তু যখন সেই ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হয়। হাজার হাজার শিক্ষক মানসিক চাপের মধ্যে কাজ করতে বাধ্য হন, অনেকেই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। শিক্ষার্থীদের মধ্যেও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হ্রাস পায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনার ক্ষতি দৃশ্যমান এবং আংশিকভাবে পুনরুদ্ধারযোগ্য—পাঠ্যসূচি সমন্বয়, অতিরিক্ত ক্লাস ও মূল্যায়নের মাধ্যমে তা কিছুটা পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু শৃঙ্খলা, শিক্ষক মর্যাদা ও প্রশাসনিক কাঠামোর অবক্ষয় দীর্ঘস্থায়ী এবং পুনর্গঠন অনেক বেশি জটিল।

বর্তমানে নতুন সরকারের অধীনে শিক্ষা খাত পুনর্গঠনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা—এসব এখন সময়ের প্রধান দাবি। শিক্ষা খাতকে পুনরায় জাতীয় উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে এই দ্বিমুখী সংকটের শিক্ষা গ্রহণ করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।